ঢাকা মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২
amaderkhobor24.com

৯ বছর পর আজ খুলছে গোমা সেতু, সময় বাঁচবে ২ ঘণ্টা

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

৯ বছর পর আজ খুলছে গোমা সেতু, সময় বাঁচবে ২ ঘণ্টা

সকালের কুয়াশা ভেদ করে নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ। ওপারে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা, কখন ফেরি ভিড়বে! কখনো আধাঘণ্টা, কখনো এক ঘণ্টা, কখনো আবার নদীর স্রোত বা যান্ত্রিক সমস্যায় অপেক্ষা আরো দীর্ঘ হয়। বরিশালের বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালীর দুমকির মানুষ বছরের পর বছর এভাবেই নদী পার হয়েছেন। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার গল্পের অবসান হতে চলেছে।

বরিশালের রাঙ্গামাটিয়া নদীর ওপর নির্মিত গোমা সেতুর কাজ শেষ হয়েছে প্রায় নয় বছর পর। আজ মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) দুপুরের দিকে উদ্বোধনের পর সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জনাব হাবিবুর রশিদ সেতুর উদ্ধোধন করবেন।

সেতুটি চালু হলে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে পটুয়াখালীর দুমকির সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

দুই জেলার প্রত্যন্ত এলাকার অন্তত পাঁচ লাখ মানুষের যাতায়াতে ভোগান্তি কমবে। যাতায়াতের সময়ও কমে আসবে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা।

ফেরির ঘাট থেকে সেতুর স্বপ্ন
দীর্ঘদিন ধরে এই নদী পারাপারের প্রধান ভরসা ছিল ফেরি বা ইঞ্জিনচালিত নৌকা। বিশেষ করে বরিশাল-লক্ষ্মীপাশা-দুমকি জেলা সড়কে চলাচলকারী মানুষের জন্য এটি ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা।

স্থানীয়দের ভাষায়, নদী পার হওয়া মানেই অনিশ্চয়তা। কখন ফেরি আসবে, কখন নদী পার হওয়া যাবে তা নিশ্চিত করে বলা যেত না।

আতহার উদ্দিন টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এই সেতু চালু হলে দুমকিতে যেতে অন্তত দেড় ঘণ্টা সময় বাঁচবে। শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী সবাই উপকৃত হবেন।’

বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান বলেন, ‘গোমা সেতু চালু হলে বাকেরগঞ্জ ও দুমকী উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর হবে।

কৃষিপণ্য, মাছসহ বিভিন্ন পণ্য দ্রুত সময়ের মধ্যে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত পরিবহন করা সম্ভব হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’    
নয় বছরের দীর্ঘ পথ
এই সেতু নির্মাণের গল্পও কম দীর্ঘ নয়। ২০১৭ সালে প্রায় ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্প হিসেবে সেতুটি অনুমোদন পায়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। শুরুতেই উচ্চতা নিয়ে আপত্তি তোলে বিআইডব্লিউটিএ। তাদের দাবি ছিল, নদীপথ সচল রাখতে সেতুর উচ্চতা আরো বাড়াতে হবে।

প্রথম নকশায় সেতুর মাঝ বরাবর সর্বোচ্চ জোয়ারের সময় উচ্চতা ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ৬২ মিটার। পরে তা বাড়িয়ে ১২ দশমিক ২০ মিটার করা হয়। এই পরিবর্তনের কারণে পুরো নকশাই সংশোধন করতে হয়। নতুন নকশায় সেতুর মাঝখানে স্টিল ট্রাস স্প্যান যুক্ত করা হয়।

বাড়ল সময়, বাড়ল ব্যয়
নকশা পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণ ও নদী শাসনের কাজ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পটির সময়সীমা পাঁচবার বাড়ানো হয়। ব্যয়ও বেড়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। সংশোধিত প্রকল্পে সেতুর ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা, যা প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

সেতুটির দৈর্ঘ্য ২৮৩ দশমিক ১৮৮ মিটার এবং প্রস্থ ১০ দশমিক ২৫ মিটার। দুই লেনের এই সেতুতে পিসি গার্ডারের পাশাপাশি স্টিল ট্রাস ব্যবহার করা হয়েছে, যা দক্ষিণাঞ্চলে এ ধরনের প্রথম সেতু বলে জানিয়েছেন সওজের প্রকৌশলীরা।

সেতুটির ঠিকাদার মো. মাহফুজ খান বলেন, ‘উচ্চতা বৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন এবং নদী শাসনের কাজ বাড়ার কারণেই সময় ও ব্যয় দুইই বেড়েছে।’

বরিশাল সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর ধারা পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণ এবং সেতুর উচ্চতা বৃদ্ধি—এই তিন কারণে বারবার নকশা সংশোধন করতে হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরের দিকে উদ্বোধনের পরই সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।’

বদলে যাবে যোগাযোগ
গোমা সেতু চালু হলে বরিশালের বাকেরগঞ্জ সদর থেকে পটুয়াখালীর দুমকিতে যেতে আর নদীর ঘাটে অপেক্ষা করতে হবে না। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী সবাই সরাসরি সড়ক পথে যাতায়াত করতে পারবেন। পণ্য পরিবহন সহজ হবে, স্থানীয় অর্থনীতিও নতুন গতি পাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর তাই এই সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি দুই জেলার মানুষের জন্য নতুন পথের প্রতীক। রাঙ্গামাটি নদীর ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্টিল ট্রাসের কাঠামো যেন বলছে, নয় বছরের অপেক্ষার শেষে অবশেষে শুরু হচ্ছে এক নতুন যাত্রা।

Link copied!