প্রকাশিত: মার্চ ১৫, ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
দেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেশি দাম পান। অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা এবং ভিন্ন ভিন্ন মূল্য নির্ধারণ কৌশলের কারণে ইইউ বাজারে দাম তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্য অগ্রাধিকার সুবিধা কমে গেলে রপ্তানিকারকরা শুধু বাজারে প্রবেশাধিকার নয়, পণ্যের দাম বা আয়ের ক্ষেত্রেও চাপের মুখে পড়তে পারেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের (ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ) সম্মেলন কক্ষে এক আলোচনা সভায় ‘অগ্রাধিকার ও অ-অগ্রাধিকার বাজারে রপ্তানি মূল্য: এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণার ফল উপস্থাপন করেন র্যাপিডের উপপরিচালক জিল্লুর রহমান। বাংলাদেশ কাস্টমসের দৈনন্দিন লেনদেনভিত্তিক প্রায় তিন হাজার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ। এতে আরও বক্তব্য দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহিম খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. তৈয়েবুর রহমান, বিশ্বব্যাংকের ট্রেড পলিসি ও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন-বিষয়ক উপদেষ্টা হাফিজুর রহমান, ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. মুনির চৌধুরী, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা প্রমুখ।
গবেষণার ফল তুলে ধরে জিল্লুর রহমান বলেন, একই ধরনের পোশাক পণ্য হলেও গন্তব্যভেদে রপ্তানির দামে বড় পার্থক্য দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় জার্মানির বাজারে বাংলাদেশি টি-শার্ট রপ্তানিতে ২০ থেকে ২৭ শতাংশ বেশি দাম পাওয়া যায়। আবার জার্মানিতে ট্রাউজার রপ্তানিতে ৯ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দাম পাওয়া যায়। এভাবে প্রধান ১০টি পোশাক পণ্যের ক্ষেত্রেও শীর্ষ রপ্তানিকারকরা ইইউ বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেশি দাম পাচ্ছেন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, অগ্রাধিকারমূলক বাজার (ইইউ) ও অগ্রাধিকারবিহীন বাজারের (যুক্তরাষ্ট্র) মধ্যে একটি ধারাবাহিক মূল্য পার্থক্য রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিনিময় হার পরিবর্তনের প্রভাবও পুরোপুরি রপ্তানি মূল্যে প্রতিফলিত হয় না। এতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকরা মুদ্রার অবমূল্যায়নের প্রায় ৫৫ শতাংশ নিজেদের কাঁধে নিয়ে নেন। ইইউর ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৪০ শতাংশ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান শুধু ইইউতে রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কেবল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে। বাকি ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান দুই বাজারেই রপ্তানি করেছে। তবে মোট পোশাক রপ্তানি আয়ের ৬৬ শতাংশের বেশি এসেছে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে, যারা একই সঙ্গে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় বাজারে রপ্তানি করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বৈশিষ্ট্যও রপ্তানি মূল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় বাজারেই ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি দামে পণ্য বিক্রি করতে পারে। এর পেছনে বড় ক্রেতাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ, উন্নত পণ্যের মান এবং দরকষাকষির ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এলডিসি উত্তরণের পর সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা।
আব্দুর রহিম খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পকে নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। তিনি বলেন, সরকার তিন বছরের অতিরিক্ত ট্রানজিশন সময় পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সময় পেলেও প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই।
হাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশ তুলনামূলক কম দামে পণ্য রপ্তানি করে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে। তবে গবেষণার ফল থেকে বোঝা যায়, রপ্তানি মূল্যের সঙ্গে শুল্ক কাঠামোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
মো. মুনির চৌধুরী বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণে তথ্যভিত্তিক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :