প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম
তারেক রহমান
প্রায় দুই দশক নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফেরার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জনমত জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ক্ষমতায় গেলে দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন তারেক রহমান। তাঁর ভাষায়, কোনো একক শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা নয়; বরং বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই হবে তাঁর লক্ষ্য।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত পণ্যের মতো খাত বিকাশের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী পদে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছর সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তারেক রহমানের মতে, এতে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে।
দেশে ফেরার পর সময় কীভাবে কেটেছে, তা নিয়েও নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তিনি। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেশে ফেরার পর প্রতিটি মিনিট কীভাবে কেটে গেছে, সেটা বুঝতেই পারিনি।’ সাক্ষাৎকারের সময় তাঁর পাশে ছিলেন মেয়ে জাইমা রহমান, যিনি নির্বাচনী প্রচারণায় বাবার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন তারেক রহমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেননি। পরবর্তীতে বস্ত্র ও কৃষিপণ্য খাতে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে তিনি ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন। যদিও কোনো সরকারি পদে ছিলেন না, তবুও তাঁর বিরুদ্ধে ‘সমান্তরাল ক্ষমতাকেন্দ্র’ পরিচালনার অভিযোগ ওঠে—যা তিনি বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন। দেশে ফেরার পর নিজেকে তিনি সংযত ও সমঝোতাপ্রবণ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিশোধ মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। এতে কোনো ভালো কিছু আসে না। আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি দরকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা।’
শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতি মামলা দায়ের হয়। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তাঁকে অনুপস্থিতিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তিনি এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব মামলায় তিনি খালাস পান।
দেশে ফিরে তারেক রহমান উত্তেজনাকর বক্তব্য এড়িয়ে চলছেন এবং পুনর্মিলন ও সহনশীলতার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি ‘রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া’ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বলছেন, যা বিএনপির নেতা–কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে তাঁর পরিবারের পোষা সাইবেরিয়ান বিড়াল ‘জেবু’। এ বিষয়ে তাঁর মেয়ে জাইমা রহমান বলেন, ‘ওর বয়স সাত বছর। আমরা তাকে দত্তক নিয়েছি।’
দলের ভেতরে তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ এখন সুসংহত। বিএনপির নেতাদের মতে, প্রার্থী নির্বাচন, নির্বাচনী কৌশল এবং জোট আলোচনা—সব ক্ষেত্রেই তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা আগে বিদেশ থেকে পরিচালিত হতো।
রাজনৈতিক বংশপরম্পরার অংশ হলেও তারেক রহমানের দাবি, তাঁর প্রধান লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনর্গঠন ও তা টিকিয়ে রাখা। তাঁর কথায়, ‘গণতন্ত্র চর্চা করলেই আমরা সমৃদ্ধ হতে পারি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারি।’
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান ২০০৮ সালে সামরিক–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থান করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–যুব নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বর্তমানে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। এই প্রেক্ষাপটে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। সে সময় তাঁকে ঘিরে দলের নেতা–কর্মীদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেছেন দুই নারী নেতা—শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। অন্যদিকে, তারেক রহমানের বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন এবং পরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
আপনার মতামত লিখুন :