সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জসহ দেশের হাওর অঞ্চলের কৃষকদের ওপর নেমে এসেছে প্রকৃতির নির্মম পরিহাস। বছরের একমাত্র সম্বল বোরো ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে দিশেহারা হাজারো কৃষক পরিবার। আগাম অতিবৃষ্টি, উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল আর শ্রমিকের অভাব—সব মিলিয়ে এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান এই খাদ্যভাণ্ডার।
সুনামগঞ্জের হাওর এখন যেন এক থইথই সমুদ্র। তার মাঝে দ্বীপের মতো জেগে থাকা সামান্য জায়গায় ধান শুকাতে ব্যস্ত রঞ্জু হালদার ও তাঁর ভাতিজা নিক্সন রায়ের মতো কৃষকেরা। আগাম অতিবৃষ্টি তাঁদের সব কেড়ে নিয়েছে। অনেক কষ্টে কিছু ধান কেটে আনতে পারলেও এখন বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ধান শুকানো ও সঠিক দাম পাওয়া। হাওরের মানুষের কাছে ধানই একমাত্র জীবন-জীবিকা, আর সেই সোনার ফসলই এখন জলের নিচে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ ও নিকলী উপজেলার চিত্র আরও ভয়াবহ। মানিকপুর হাওরের কৃষক জহিরুল ইসলাম ৩৫০ মণ ধান মাড়াই করে খলায় স্তূপ করে রেখেছিলেন। টানা সাত দিনের বৃষ্টিতে সেই ধানে চারা গজিয়ে গেছে এবং ধান পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নিরুপায় হয়ে তিনি পচে যাওয়া ধান আজ হাওরের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছেন। একই দশা কৃষক তমিজ উদ্দিনের; তাঁর ৭০ বস্তা পচে যাওয়া ধানও আজ হাওরের জলে বিসর্জন দিতে হয়েছে।
নিকলীর মজলিশপুর এলাকার কৃষক কালা মিয়া ১০ কানি জমির ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। আধা পাকা ধান তাড়াহুড়ো করে কাটলেও মাড়াই মেশিনের অভাবে তা নষ্ট হয়ে কালো হয়ে গেছে। অন্যদিকে, চড়া দাম দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক না পাওয়ায় মাঠের পাকা ধান চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে। মিঠামইনের ঢাকি এলাকার কৃষক কামাল হোসেন পরিস্থিতির চাপে ঘোষণা দিয়েছেন, যার ইচ্ছা সে যেন এসে ধান কেটে নিয়ে যায়, কারণ তাঁর পাঁচ একর জমির ধান কাটার মতো কোনো উপায় অবশিষ্ট নেই।
করিমগঞ্জের জহির মিয়াসহ অনেক কৃষক বাড়ির ছোট-বড় সবাইকে নিয়ে কোমর সমান পানিতে নেমে ধান কেটেছিলেন। কিন্তু রোদের দেখা না মেলায় এবং এক সপ্তাহ ধরে স্তূপ করে রাখায় সেই ধান এখন কৃষকদের কাছে `গলার কাঁটা` হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারা গজিয়ে যাওয়া পচা ধান হাওরের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই তাঁদের কাছে।
এমন চরম দুর্দিনেও কৃষকদের মনে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা। সংসদে তিনি হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য আগামী তিন মাস খাদ্য সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া কৃষকেরা এখন এই সহায়তার দিকেই তাকিয়ে আছেন। তাদের প্রত্যাশা, সরকারি সহায়তার সুষম বণ্টন যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দোরগোড়ায় দ্রুত পৌঁছায়।
হাওর অঞ্চলের এই দুর্যোগ শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও এক বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকের শ্রমের ফসল রক্ষায় এবং আগামী দিনে এমন বিপর্যয় মোকাবিলায় আরও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।