প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি অর্থনীতিবিদ এড হির্স সতর্ক করেছেন যে, এই উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
বুধবার (৪ মার্চ) আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই লেকচারার জানান, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত তেলের অর্ধেক সরবরাহও যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়বে। বিশেষ করে মার্কিন নৌবাহিনী এই পথে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে আর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে না পারায় এই ঝুঁকি আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
ব্রেন্ট ক্রুড গ্লোবালে দেখা গেছে ফেব্রুয়ারির শেষের দিক থেকে মার্চের শুরুতে ব্যারেল প্রতি দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ১১ ডলারেরও বেশি। ৭২ থেকে ৪৮ ডলার থেকে আজ এসে দাড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ৫১ ডলারে।
জ্বালানি বাজারের বর্তমান অস্থিরতা উল্লেখ করে এড হির্স বলেন যে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজারে ইতিমধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অভিযানের প্রথম দিনেই এলএনজির দাম ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গত সোমবার ও মঙ্গলবারের ব্যবধানে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
হির্স আরও জানান যে, ডিজেলের দামও বর্তমানে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গ্যাসনির্ভর দেশগুলো এখন বিকল্প হিসেবে পেট্রোলিয়াম মজুত করতে শুরু করেছে, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যের ভবিষ্যৎ জ্বালানি অর্ডারের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
ইরাকের বসরায় অবস্থিত রুয়াইলা তেলক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি এই সংকটের গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার ফলে ইরাক তাদের দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো রুয়াইলা তেলক্ষেত্রে গ্যাস ফ্লেয়ারের আগুনের শিখার যে ছবি প্রকাশ করেছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অসহায়ত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। এই সরবরাহ ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এশিয়া ও ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই জ্বালানি সংকট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে হির্স সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য জনজীবনে নাভিশ্বাস তুলবে, যা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তায় ধস নামাতে পারে।
অর্থনীতির এই অস্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সামগ্রিকভাবে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা কাটানো না গেলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :