ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
amaderkhobor24.com
বগুড়ার সবজি বাজার

ফড়িয়াদের কারণে অর্ধেক দাম পান কৃষক

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ০১:৫৬ পিএম

ফড়িয়াদের কারণে অর্ধেক দাম পান কৃষক

বগুড়ার মাঠে কৃষক পটোল বিক্রি করছেন কেজি ৩০ টাকায়। সেই পটোল মহাস্থান হাটে এসে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। এরপর মাত্র ১০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে একই পটোলের দাম উঠছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। অর্থাৎ কৃষকের কষ্টের সবজি তাদের কাছ থেকে শহরের ক্রেতার হাতে পৌঁছতে কেজিতে দাম বাড়ছে ৩০ টাকা। শসার ক্ষেত্রেও প্রায় একই চিত্র। কৃষক বিক্রি করছেন ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। মহাস্থানে সেই শসা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। আর ফতেহ আলী বাজারে দাম উঠছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন, শ্রমিক, খাজনা, পচন ও অন্যান্য খরচের কারণে দাম বাড়ে। কিন্তু সরেজমিন পাওয়া হিসাব বলছে, তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়লেও কেজিতে সেই বাড়তি খরচ অনেক ক্ষেত্রে এক টাকারও কম। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার হাতে আসতে সবজির দাম এতটা বাড়ছে কেন? গতকাল সোমবার মহাস্থান হাট ও ফতেহ আলী বাজার ঘুরে কৃষক, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা, পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে সবখানেই ফড়িয়াদের কারসাজির এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

কৃষকের দামে কমতি
মহাস্থান হাটে সোমবার কৃষকের কাছ থেকে পটোল কেনা হয়েছে কেজি ৩০ টাকা দরে। হাটে হাতবদলের পর সেটিই বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকায়। ফতেহ আলী বাজারে মানভেদে দাম হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। শসার ক্ষেত্রেও কৃষক ৩০-৩৫ টাকা পেলেও মহাস্থানে দাম ৪০ টাকা এবং শহরে ৫০-৬০ টাকা। ব্যবসায়ীদের দাবি, হাট থেকে শহরে আনতে পরিবহন, শ্রমিক, খাজনা, বাছাই ও নষ্ট পণ্যের খরচ রয়েছে। এসব খরচ যোগ করেই খুচরা দাম ঠিক করতে হয়।

তবে তেলের দাম বাড়লেও মহাস্থান হাটে গত সাত দিনে কয়েকটি সবজির দাম কমেছে। পটোল ৪০ টাকা থেকে নেমে ২৫-৩০ টাকা, করলা ৫৫ থেকে ৪৫, ফুলকপি ৭০-৮০ এবং মুলা ৩৫ থেকে ২২ টাকা হয়েছে। লেবুও ৩০ টাকা থেকে কমে ২০ টাকা হালি হয়েছে। অথচ সোমবারও ফতেহ আলী বাজারে পটোল ৫০-৬০, করলা ৮০ এবং ফুলকপি ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ হাটে দাম কমলেও শহরের বাজারে তার প্রভাব খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

সবজি বিক্রির সময় কৃষককে কেজিপ্রতি এক টাকা খাজনা দিতে হয় বলে জানিয়েছেন হাটে আসা কৃষকরা। এর সঙ্গে আছে ধলতা বা বাড়তি ওজন। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ৪০ কেজির এক মণের জায়গায় অনেক সময় ৪২ থেকে ৪৩ কেজি সবজি দিতে হয়। দূরের বাজারে নেওয়ার পথে কিছু সবজি নষ্ট হয় এবং ওজন কমে যায়। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই বাড়তি সবজি নেওয়া হয়।

কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ৪০ কেজি পটোল ৩০ টাকা দরে বিক্রি করলে দাম হয় এক হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু একই টাকা পেতে ৪২ কেজি পটোল দিতে হলে প্রকৃত দর দাঁড়ায় কেজিতে ২৮ টাকা ৫৭ পয়সা। ৪৩ কেজি দিলে তা ২৭ টাকা ৯১ পয়সায় নেমে আসে। এর সঙ্গে খাজনাও দিতে হয়।
কৃষক শাহিদ আলী বলেন, মাঠের শ্রমিক, গাড়িভাড়া, হাটের খাজনা ও গন্তব্যে শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে উৎপাদিত সবজির পেছনে আরও টাকা খরচ হয়। তাই বাজারে দাম থাকলেও কৃষকের হাতে লাভ খুব বেশি থাকে না।

তেলের দাম বাড়লেও ভাড়া খুব বাড়েনি 
তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর দূরের পথে পরিবহন খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চালক ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সেই বাড়তি খরচ পুরোটা সবজির কেজিতে কতটা পড়ে, সেটি হিসাব করলে অঙ্কটা খুব বড় নয়।

চালক মোবারক হোসেন জানান, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জে পিকআপের ভাড়া আগে ছিল তিন হাজার ৫০০ টাকা। এখন তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার টাকা। এক ট্রিপে প্রায় ১৫ লিটার তেল লাগে।
ট্রাকচালক শফিকুর রহমান বলেন, বগুড়া থেকে টাঙ্গাইলের ভাড়া আগে ছিল আট হাজার টাকা। এখন ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকা। তাঁর ট্রাকে চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার কেজি পণ্য যায়। ফলে এক হাজার টাকা ভাড়া বাড়লেও তা সবজির কেজিতে ভাগ করলে বাড়তি খরচ হয় প্রায় ২০ পয়সা।

চট্টগ্রাম রুটের চালক শরিফুল ইসলামের হিসাবে, আগে বগুড়া-চট্টগ্রাম যাওয়া-আসায় ভাড়া ছিল ২৪-২৫ হাজার টাকা। এখন ২৮-৩০ হাজার টাকা। তাঁর ট্রাকে প্রায় ১৪ হাজার কেজি সবজি যায়। হিসাব করে দেখা যায় এই চার-পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়ার প্রভাব কেজিতে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩৫ পয়সা।

তবে পাইকারি ব্যবসায়ী শাহিনুর ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামে মিনি ট্রাকের ভাড়া আগে ১৮ হাজার টাকা থাকলেও এখন ২৫ হাজার টাকা দিয়েও গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকার ভাড়াও প্রায় ৯ হাজার থেকে বেড়ে ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।

মহাস্থান থেকে বগুড়া শহরে সবজি আনতে বৈদ্যুতিক ভ্যানের ভাড়া আগে ১৫০ টাকা থাকলেও এখন ২৫০ টাকা হয়েছে বলে জানান চেলোপাড়ার ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম। একটি ভ্যানে প্রায় ১৬০ থেকে ২০০ কেজি সবজি ওঠে। অর্থাৎ ভাড়া ১০০ টাকা বাড়লেও প্রতি কেজিতে বাড়তি খরচ হচ্ছে প্রায় ৫০ থেকে ৬৩ পয়সা। পরিবহন ছাড়াও পলিথিন, শ্রমিক, খাজনা, বাছাই ও নষ্ট পণ্যের খরচ রয়েছে। লাভ রাখতে গিয়ে এসব খরচ খুচরা দামের সঙ্গে যোগ করতে হয়।

বগুড়ার সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, ব্যবসায়ীদের হিসাবের জায়গায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পটোল কৃষকের কাছ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে কেনার পর শহরে ৫০-৬০ টাকা হলেও মহাস্থান থেকে শহরে আনার বাড়তি ভাড়া কেজিতে এক টাকার মতো। দূরের রুটে বাড়তি ট্রাকভাড়াও অনেক ক্ষেত্রে কেজিতে এক টাকা ছাড়াচ্ছে না।

ভোক্তার পকেটেই শেষ চাপ
ফতেহ আলী বাজারে কথা হয় কয়েক ক্রেতার সঙ্গে। তাদের অভিযোগ, কৃষক কম দামে বিক্রি করলেও শহরে এসে সবজির দাম অনেক বেড়ে যায়। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তা দুপক্ষই চাপে থাকছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মোস্তফা কামাল বলেন, বেতন বাড়েনি, অথচ বাজারে প্রতিদিনের খরচ বাড়ছে। মনজুরুল হক নামের এক ক্রেতা বলেন, কৃষক কম দামে বিক্রি করছেন, আবার শহরে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। মাঝখানে কোথায় কত টাকা বাড়ছে, তার হিসাব থাকা দরকার।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বগুড়ার সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং তার প্রভাব পণ্যের দামে পড়তে পারে। তবে তেলের দাম বাড়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোনো ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে পারেন না।

Link copied!