ঢাকা শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২
amaderkhobor24.com

অবহেলায় বাড়ছে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: মার্চ ১৪, ২০২৬, ১২:২৭ পিএম

অবহেলায় বাড়ছে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি

পরিবারের সবার যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব সাধারণত নারীর কাঁধেই থাকে। কিন্তু নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক নারীই পিছিয়ে থাকেন। ব্যস্ততা, সামাজিক সংকোচ, সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা নিতে অনীহা—এসব মিলেই নারীদের নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যাকে দীর্ঘদিন অদৃশ্য করে রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবহেলাই পরবর্তীতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা এখনও তুলনামূলক কম। ফলে অনেক রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ার সুযোগ হারায় এবং চিকিৎসা শুরু হতে হতে তা জটিল আকার ধারণ করে।

পুষ্টির ঘাটতিতে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা
কৈশোর থেকেই অনেক মেয়ের শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। বিশেষ করে আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি-এর অভাব নারীদের মধ্যে বেশ সাধারণ। নিয়মিত সুষম খাদ্য না খাওয়া, দুধ বা ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার কম খাওয়া এবং রোদে কম সময় থাকা—এসব কারণে এই সমস্যা বাড়ে।

এর ফলে রক্তস্বল্পতা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং অল্প বয়সেই হাঁটু বা কোমরব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, পুষ্টির ঘাটতি দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে তা ভবিষ্যতে অস্টিওপোরোসিসের মতো গুরুতর রোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আর্থিক সংগতি কম থাকলেও কীভাবে দামি খাবারের বিকল্প দিয়ে পুষ্টির চাহিদা মেটানো যায়, সে জ্ঞান অনেকেরই নেই।

হরমোনজনিত সমস্যায় বাড়ছে জটিলতা
নারীদের শরীরে হরমোনের পরিবর্তন তুলনামূলক বেশি হয়। কৈশোর, মাতৃত্ব এবং মেনোপজ—এই তিনটি পর্যায়ে হরমোনের বড় পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু অনেক সময় এসব পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাগুলোকে স্বাভাবিক ভেবে অবহেলা করা হয়।

মাসিকের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে অনেকেই সংকোচ বোধ করেন। আবার কিশোরী মাসিকজনিত সমস্যার কথা জানালেও অনেক সময় মা-খালারা বলে দেন, এগুলো স্বাভাবিক বিষয়। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), বয়সের আগেই বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো কিংবা নির্দিষ্ট বয়স পেরিয়ে গেলেও বয়ঃসন্ধি না হওয়ার মতো সমস্যাগুলোকেও গুরুত্ব দেয় না অনেক পরিবার।

এছাড়াও অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, ত্বকের সমস্যা কিংবা হরমোনজনিত অন্যান্য সমস্যা অনেক সময় দীর্ঘদিন অচিকিৎসিত থেকে যায়। কারণ এসব বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে এখনও অনেক পরিবারে সংকোচ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সমস্যা সময়মতো শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে পরবর্তী জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

শরীরচর্চার অভাবে বাড়ছে ঝুঁকি
স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত শরীরচর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক নারীই তা নিয়মিত করেন না। ব্যস্ত জীবনযাপন, নিরাপদ জায়গার অভাব কিংবা সামাজিক সংকোচ—সব মিলিয়ে অনেকেই শারীরিক ব্যায়াম থেকে দূরে থাকেন।

অনেকের মধ্যে আবার মাসিকের সময় শরীরচর্চা করা যাবে না—এমন ভুল ধারণাও রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, হালকা ব্যায়াম বরং শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও কমাতে পারে।

পানি কম পান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
অনেক নারী বাইরে গেলে অস্বস্তির কারণে বা পরিষ্কার টয়লেট না থাকার আশঙ্কায় পানি কম পান করেন। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখেন। এই অভ্যাসের কারণে মূত্রনালির সংক্রমণ, কিডনির সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, শরীর সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় শরীরের পানিশূন্যতা বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে।

সংকোচে দেরি হয় চিকিৎসা
নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার অন্যতম বড় কারণ সামাজিক সংকোচ। অনেক নারী স্তন বা জরায়ুমুখে কোনো সমস্যা দেখা দিলেও চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। আবার অনেক সময় নারী চিকিৎসক না পাওয়ার কারণে সমস্যার কথা বলতে দ্বিধা বোধ করেন।

ফলে অনেক রোগী তখনই চিকিৎসকের কাছে যান, যখন রোগটি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে এসব রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা সহজ হয় এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

ডায়াবেটিসের তেমন উপসর্গ থাকে না। অথচ নীরবেই নানা জটিলতার কারণ হয়ে ওঠে এই রোগ। তাই ৪০ পেরোলে বছরে অন্তত একবার সবারই কিছু পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। অথচ অধিকাংশ নারী এসব পরীক্ষা করান না। পরিবারেরও এ বিষয়ে খেয়াল থাকে না। পরে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো জটিলতা সৃষ্টি হয়।

মাতৃত্ব ও প্রজননস্বাস্থ্য
প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কেও সচেতনতার অভাব রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। অনেকেই বিয়ের সঠিক বয়সের দিকে খেয়াল রাখেন না। কোথাও মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ হওয়ার আগে, কোথাও আবার ক্যারিয়ার গড়তে ৩০ পেরিয়ে যায়।

খুব কম বা খুব বেশি বয়সের মাতৃত্ব ঝুঁকিপূর্ণ। আর ৩০–এর পর গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমতে থাকে। আবার প্রসবের পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়া বা সঠিক পরিচর্যার অভাবেও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হতে পারে।

মেনোপজের সময়কার কষ্টগুলো কমাতে যে একজন হরমোনবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, এটা জানেনই না অনেকে। এ সময় একজন নারী ঘরে-বাইরে নানা অস্বস্তিতে পড়েন।

মানসিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও নারীদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পারিবারিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব, সামাজিক বৈষম্য কিংবা ব্যক্তিগত নানা সমস্যার কারণে অনেক নারী মানসিক চাপ বা বিষণ্নতায় ভোগেন।

কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা বা চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও অনেক সামাজিক বাধা রয়েছে। ফলে অনেক নারী নীরবে মানসিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করেন।

সচেতনতা বাড়ানোই সমাধান
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের সুস্থ রাখতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি।

নারীরা যদি নিজের স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেন, তাহলে অনেক রোগই প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

Link copied!