ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে বিরত রাখতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এটি তাদের প্রধান দাবিগুলোর একটি। দাবিটি না মানায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে তারা। এতে একটি বড় অন্যায্য যুদ্ধের সূচনা হয়। অথচ ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির শক্ত কোনো প্রমাণ মেলেনি। এরপরও যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। কিছু দেশ উল্টো পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। ফলে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। গতকাল সোমবার আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে এসব কথা উঠে এসেছে।
পরিস্থিতি যখন এই পর্যায়ে, তখন আজ মঙ্গলবার নিউইয়র্কে শুরু হচ্ছে এনপিটির ১১তম পর্যালোচনা সম্মেলন। এতে অংশ নেবে ইরানসহ ১৯১টি দেশ। ইরানে অন্যায্য হামলার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। এবারের সম্মেলনে চুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মহৎ অঙ্গীকারটি পরীক্ষার সম্মুখীন বলে মনে করা হচ্ছে।
১৯৭০ সালে এনপিটি চুক্তি কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে অধিকাংশ দেশ বর্তমান বৈশ্বিক পারমাণবিক ব্যবস্থা মেনে নিয়েছে। চুক্তির অধীনে থাকা পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন দেশগুলো (ইরানসহ) কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন না করতে সম্মত হয়। অন্যদিকে স্বীকৃত পাঁচটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া অস্ত্রের বিস্তার রোধ করতে এবং মজুত নিরস্ত্রীকরণে সচেষ্ট থাকতে সম্মত হয়েছে।
এনপিটির সব সদস্য দেশ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএএইএ) তত্ত্বাবধানে থাকা সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের অধিকার রাখে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর দেশগুলো চুক্তি মানা হচ্ছে কিনা, তা পর্যালোচনা করার জন্য মিলিত হয়। সম্মেলন চলবে আগামী ২২ মে পর্যন্ত।
ইরানের বিষয়টি এবারের সম্মেলনের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তা হলো পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন রাষ্ট্রগুলোকে কোনো সুরক্ষা দেয় এনপিটি? আইএইএ ইরানের কোনো সুসংগঠিত পারমাণবিক কর্মসূচির প্রমাণ খুঁজে পায়নি, যা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিতও করেছে। তবে আইএইএ ইরানের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাতেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ক্ষিপ্ত হয়ে ইরানের ওপর হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করে। এই জবরদস্তিমূলক পন্থা এনপিটির জন্য ক্ষতিকর।
নিউইয়র্কের পর্যালোচনা সম্মেলনে এখন এই অন্ধকারময় বিষয়টিই ঝুলে আছে। সম্মেলনে জমা দেওয়া ইরানের কার্যপত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করা হয়েছে। তেহরান চুক্তির চতুর্থ অনুচ্ছেদ এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকারের কথা উল্লেখ করেছে। দেশটি যুক্তি দেখিয়েছে, সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা এই চুক্তির মূল যুক্তিকেই লঙ্ঘন করে। ইরান এনপিটি গ্রহণ না করা ইসরায়েলের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
এদিকে এনপিটি সম্মেলনের স্থান যুক্তরাষ্ট্রে হওয়াটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদি যুদ্ধ না হতো, তবে মতপার্থক্য নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পূরক আলোচনার ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক একটি সুবিধাজনক স্থান হতে পারত। এরপরও বিশেষজ্ঞরা ইরানকে নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করার পক্ষে।
আগামী চার সপ্তাহ এনপিটির সদস্য দেশগুলোর অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনার ওপর হামলা অগ্রহণযোগ্য, এই দাবি নিশ্চিত করতে আওয়াজ তুলতে পারে। তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিতর্কটিকে চুক্তির প্রকৃত শর্তাবলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিতে পারে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনা এনপিটির কোনো আবশ্যিক শর্ত নয়। দেশগুলো ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্বচ্ছতা ও এনপিটির সদস্যপদ না থাকার কারণে সৃষ্ট আঞ্চলিক ভারসাম্যহীনতার বিষয়টিও উত্থাপন করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর উচিত, যুদ্ধের মাধ্যমে এনপিটির মৌলিক অঙ্গীকারকে নতুন করে লেখা হতে না দেওয়ার বিষয়টি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করা।