ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩
amaderkhobor24.com
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

ট্রাম্প কোন আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে চুক্তি করলেন

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: জুন ১৯, ২০২৬, ০১:০৩ পিএম

ট্রাম্প কোন আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে চুক্তি করলেন

ইরান যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, তা নিয়ে মাত্র ১৫ সপ্তাহ আগে সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তখন তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।’

তবে গত বুধবার যখন যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে করা সমঝোতা স্মারকের বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হলো, তখন সেটিকে মোটেও আত্মসমর্পণের দলিল মনে হয়নি। বরং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে ইরান শুধু টিকে থাকেনি, উদ্‌যাপন করার মতো অনেক কিছু নিয়েও যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে এসেছে।

প্রথমেই রয়েছে তেহরানের শত শত কোটি ডলারের তেল বিক্রির সুযোগ ফিরে পাওয়া। এর ফলে সংকটে থাকা ইরান সরকারের ওপর চাপ কমবে।

ট্রাম্প প্রায়ই সাংবাদিকদের মনে করিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। অভিযান শুরুর সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস, সরকারের পতন। বাস্তবে সেসবের কিছুই হয়নি।

ট্রাম্প গত রোববার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এই চুক্তি আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।

ক্ষমতার প্রভাব বা দর–কষাকষির শক্তিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া একজন প্রেসিডেন্টের জন্য এই সিদ্ধান্তও যুদ্ধের আরেকটি রহস্য হয়ে আছে। তবে ‘সমঝোতা স্মারক’-এর ভাষা ইঙ্গিত দিচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরান হয়তো হরমুজ প্রণালির ওপর স্থায়ী সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা করতে পারে।

বুধবার সন্ধ্যায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন, সেটা এমন একটি পথও দেখাচ্ছে, যার মাধ্যমে ইরান বহু বছর ধরে জব্দ থাকা শত শত ডলারের সম্পদ ফেরত পেতে পারে।

ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন, এই অর্থ কেবল ‘ভালো আচরণের’ বিনিময়ে ছাড় দেওয়া হবে। তবে বাস্তবে ট্রাম্পের এই ছাড় অনেকটাই সেই ধরনের, যা ১১ বছর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দিয়েছিলেন। অথচ এ জন্য ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ওবামার কঠোর সমালোচনা করে আসছেন।

ট্রাম্প প্রায়ই সাংবাদিকদের মনে করিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। অভিযান শুরুর সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস, সরকারের পতন। বাস্তবে সেসবের কিছুই হয়নি।

নিজ দলেও বিরোধিতা
ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের কট্টরপন্থীরা চুক্তি নিয়ে ইতিমধ্যে আপত্তি জানাতে শুরু করেছেন। কট্টর ইহুদিবাদী ইসরায়েল সরকারও আপত্তি জানিয়েছে। আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে তাদের। তারা আশঙ্কা করছে, ট্রাম্প তাদের এমন এক যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করছেন, যা হিজবুল্লাহকে ‘দুর্বল করার তাদের অভিযান’–কে ব্যহত করবে।

ইতিহাসবিদেরা বহু বছর ধরে এই সংঘাতের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করবেন। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এতে ১৩ জন মার্কিন সেনা এবং ৩ হাজারের বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন।

তবে ট্রাম্প কেন এত দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চেয়েছিলেন, সে বিষয়ে সম্ভবত সবচেয়ে পরিষ্কার উত্তর দিয়েছেন ট্রাম্প নিজেই। বুধবার ফ্রান্সের হোটেল রয়্যালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তিনি চাননি তাঁর সঙ্গে হার্বার্ট হুভারের তুলনা করা হোক।

হুভার ছিলেন সেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যাঁর আমলে শেয়ারবাজারে ধস নেমেছিল এবং শুরু হয়েছিল মহামন্দা। ট্রাম্প বলেন, ‘হুভার সব সময়ই এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যাঁর মতো আমি হতে চাইনি। আমি অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখতে চাইনি।’

পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে বিশ্বে জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যেতে শুরু করত।

অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও তেলবাজারে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি—এই দুটির সমন্বয়কেই যুদ্ধের শুরু থেকে নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে দেখেছিল ইরান। তারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সেই কৌশল বাস্তবায়ন করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা, লবণমুক্তকরণ কারখানা, হোটেল ও বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, এই কৌশল কাজ করেছে। যদি এটিই ইরানের কৌশলের প্রথম ধাপ হয়ে থাকে, তাহলে ইতিহাস বলছে, দ্বিতীয় ধাপ হতে পারে বিলম্ব আর বিলম্ব।

সাবেক মার্কিন আলোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে দক্ষ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি আগের বহু আলোচনায় অংশ নিয়ে আরও অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন।

ট্রাম্প মনে হচ্ছে ধীরগতি ও দীর্ঘ এক প্রক্রিয়ার পথই খুলে দিচ্ছেন। গত মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, গত বছরের মার্কিন বিমান হামলার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া নিয়ে তিনি খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন। বুধবার তিনি স্বীকার করেছেন, আলোচনা সম্ভবত ৬০ দিনের বেশি সময় চলবে।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প আরও বড় কোনো সাফল্যের দাবি করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তিনি ইরানকে পারমাণবিক জ্বালানির মজুত থেকে বের করাতে পারলে তিনি দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিজয়ের দাবি করতে পারবেন।

এই যুদ্ধ যদি শেষ পর্যন্ত ইরানের নেতৃত্বকে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং সেই দেশে বিক্ষোভ ও গণ–অভ্যুত্থান সৃষ্টি করে—যেমনটি সংঘাতের শুরুতে ট্রাম্প আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাহলে সেখানেও তিনি কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন।

কিন্তু আপাতত মনে হচ্ছে ঠিক উল্টো ঘটনাই ঘটছে। বরং বলা যায়, ট্রাম্প নতুন নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন।

ফলাফল কী হয়েছিল
২০২৫ সালের জুনে ইরান বোমা হামলার শিকার হয় এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবারও আগ্রাসনের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির পথে এগিয়ে যায় এবং ২০০৬ সালে প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। দেখার বিষয়, আজকাল ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হুমকি দিচ্ছেন না।

গত রোববার ট্রাম্প যখন নিউইয়র্ক টাইমসকে ফোন করেছিলেন, তখন এই প্রতিবেদক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—ইরান কি এখন উত্তর কোরিয়ার পথ অনুসরণ করতে পারে?

উত্তরে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন সম্পর্কে বলেন, তাঁর কাছে গুরুতর পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।

প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প কিমকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন। পরে তাঁকে নিরস্ত্রীকরণে রাজি করাতে তিনবার সাক্ষাৎও করেছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো ফল আসেনি।

তবে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত দেশটিকে উত্তর কোরিয়ার পথ অনুসরণে উৎসাহিত করতে পারে কি না—এই প্রশ্ন ট্রাম্প এড়িয়ে যান। তিনি কেবল জোর দিয়ে বলেন, তাঁর চুক্তিই ইরানকে থামিয়ে দেবে।

ট্রাম্প বলেন, যদি এই চুক্তি কার্যকর না থাকে, তাহলে তাঁর আরেকটি পরিকল্পনা আছে। সেটি হলো, আবার বোমাবর্ষণে ফিরে যাওয়া।

Link copied!