ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পণ্য সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বেড়েছে ডিজেলসহ জ্বালানি পণ্যের দাম। যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেলের দাম এখন রেকর্ড উচ্চতায়।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন (৩ দশমিক ৭৯ লিটার) ডিজেলের গড় দাম দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৫০ ডলারে। এক মাস আগেও এই দাম ছিল ৫ দশমিক ৬১ ডলার। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ) প্রতিদিন জ্বালানি পণ্যের দাম পর্যবেক্ষণ করে; তারা এ তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে কয়েক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি কমানোর বা বন্ধ করার কথা ভাবছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা।
আগস্ট মাসে পরিচালিত রয়টার্স/ইপসসের জরিপে ৪৭ শতাংশ ভোটার বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থাৎ জীবনযাত্রার ব্যয় মাত্রাছাড়া হয়ে গেলে সরকারি দলকে তাঁরা ভোট দেবেন না। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতি’র কথা বলেছেন অর্ধেকেরও কম ভোটার।
ম্যারিস্টের নতুন জরিপে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের ওপর বেশি আস্থা দেখিয়েছেন দেশটির নাগরিকেরা। ৪২ শতাংশ বলেছে, তারা ডেমোক্র্যাটদের ওপর আস্থা রাখছে। রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৪।
এই পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, স্বেচ্ছায় ডিজেল রপ্তানি কমানোর বিষয়ে তেল শোধনাগারগুলোর আগ্রহ আছে কি না, তা জানতে বড় কয়েকটি পরিশোধনাগারের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেছিলেন, ডিজেল রপ্তানি কমানোর বিষয়ে তাঁর সমর্থন আছে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজেল রপ্তানিকারক দেশ। তবে জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি বন্ধ করলে উল্টো ফল হতে পারে। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। কেননা অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানি করতে হয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৩১ কোটি বা ৩ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের ডিজেল আমদানি হয়েছে, একক পণ্য হিসেবে আমদানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে যা শীর্ষে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় গত অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। দাম আরও বাড়লে এই ব্যয় বাড়বে।
ডিজেলের দাম এত বাড়ল কেন
ডিজেলের বাজার স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক। ফলে বিশ্বের কোনো বড় উৎপাদক দেশে সরবরাহ কমে গেলে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও পড়ে।
রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিশোধনাগারগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ কমেছে। ফলে ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বেড়েছে।
রাশিয়ায় ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকটি বড় শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও উৎপাদন কমেছে, আবার কোথাও উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।
সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ সহযোগী ফেলো র্যাচেল জিয়েম্বো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিশোধনাগারগুলো পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উৎপাদন বেশি হচ্ছে। তা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ডিজেল মজুত কমে যাচ্ছে। দেশটির এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজেলের মজুত কমে ১০ কোটি ৭৯ লাখ ব্যারেলে নেমেছে, চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে যা সর্বনিম্ন।
বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়। দেশটির উৎপাদকেরা চাইলে ডিজেল দেশের বাজারে বিক্রি করতে পারেন, আবার আন্তর্জাতিক বাজারেও বিক্রি করতে পারেন। বিশ্ববাজারে দাম বেশি হওয়ায় তাঁদের কাছে রপ্তানিই বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
কেন রপ্তানি বন্ধ করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জীবনযাত্রার ব্যয় এখন রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। ভোক্তাদের খরচ কমাতে ডিজেল রপ্তানি কমানো বা বন্ধ করার পক্ষে চাপ দিচ্ছেন দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা।
জিয়েম্বো বলেন, এতে দেশের বাজারে ডিজেলের দাম কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কেননা খাদ্যসহ প্রায় সব ধরনের পণ্য পরিবহনে ট্রাক ব্যবহার করা হয়। ট্রাকের মূল জ্বালানি হলো ডিজেল। যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ ডিজেল রপ্তানি করে, তা দেশটির মোট অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের প্রায় ৪০ শতাংশের সমপরিমাণ।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। হোয়াইট হাউস আল-জাজিরাকে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
রপ্তানি বন্ধ করলে কী হতে পারে
রপ্তানি বন্ধ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলো বিদেশে ডিজেল বিক্রি করতে পারবে না। ফলে কাগজে-কলমে দেশের বাজারে ডিজেল বেশি থাকার কথা।
তবে গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর ভিন্ন দিক আছে। সেটা হলো, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল রেখে দিলে দেশটির মজুত দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাবে। শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। ফলে এমন হতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রকে একসময় পেট্রল আমদানি বাড়াতে হবে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল অন্য দেশগুলোর ওপর প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপকে তখন অন্য দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হবে। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে; পরিণামে দামও বাড়তে পারে।
উড ম্যাকেঞ্জির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহের ঘাটতির বড় অংশ পূরণ করার মতো অতিরিক্ত পরিশোধন সক্ষমতা এখন কেবল চীনেরই আছে। তবে চীন সেই ঘাটতি পূরণে এগিয়ে আসবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, চীন হয়তো বিষয়টি নিজেদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে নাও করতে পারে।