ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩
amaderkhobor24.com
বেনজীরকে ফেরানোর উদ্যোগ

ট্রাইব্যুনালের ১০ মামলার চিঠি পুলিশকে, নথি গোছাচ্ছে দুদক

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৯:১৬ এএম

ট্রাইব্যুনালের ১০ মামলার চিঠি পুলিশকে, নথি গোছাচ্ছে দুদক

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম, খুন ও গণহত্যার অন্তত ১০টি মামলার তদন্ত চলছে। এসব মামলার তথ্য একত্র করে পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোতে (এনসিবি) পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বেনজীরের দুনীতির সব তথ্য গোছাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আইনজীবী শিশির মনির বলেছেন, তাকে ফিরিয়ে আনার তিনটি শর্ত আছে। এগুলো পালন করতে পারলেই তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। শর্তগুলো হলো—নিখুঁত ও শক্তিশালী আইনি নথিপত্র, অভিযুক্তের পরিচয় ও মামলার তথ্যের নির্ভুল উপস্থাপন এবং ধারাবাহিক ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ও ইন্টারপোলের মাধ্যমে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও শুরু করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। গতকাল সোমবার প্রসিকিউশন কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার, তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা, ধরন এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আবদুল কাইয়ুম এবং সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলামও এই আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বেনজীরের বিরুদ্ধে আমাদের এখানে প্রায় ১০টির মতো মামলা, আমরা কিন্তু ইনভেস্টিগেশন করে যাচ্ছি এবং প্রত্যেকটার সঙ্গে তার কানেকশন আছে।’ তিনি যখন র্যাবের প্রধান ছিলেন, তখন গুমের সঙ্গে যেগুলো (মামলা) অলরেডি চলমান আছে, তার মধ্যে বিচার চলছে। বেনজীরকে শাপলা চত্বরের ঘটনার ‘অন্যতম কুশীলব’ হিসেবে বর্ণনা করে আমিনুল বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে আমাদের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। চট্টগ্রামের একরাম কমিশনার হত্যাকাণ্ড, তার সঙ্গেও তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল, সেখানেও তিনি আছেন। এবং আরো অন্তত ৭ থেকে ১০টি মামলার তদন্ত চলমান আছে, যেগুলোর প্রত্যেকটার মধ্যে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে।’ বেনজীর ‘অসংখ্য হত্যাকাণ্ডে’ জড়িত ছিলেন দাবি করে আমিনুল বলেন, তিনি র‍্যাবের প্রধান হিসেবে অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তিনি যখন পুলিশের প্রধান ছিলেন, আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, অসংখ্য অপরাধের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। সাবেক এই আইজিপিকে ফিরিয়ে আনতে ট্রাইব্যুনালের ওয়ারেন্টের কপি ইতিমধ্যে এনসিবিতে পাঠানো হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের ব্রিফিংয়ে সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলাম এনসিবির কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘রেড নোটিশ তো আসলে ইন্টারপোলের একটা ফাংশন। আমাদের এখানে একটা ব্যুরো আছে, এটাকে বলে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো, এনসিবি। এটা চালায় আমাদের পুলিশের লোকেরাই। কিন্তু কমিউনিকেশনগুলা হয় সব ইন্টারপোলের সঙ্গে। তো এখান থেকেই আমরা আসলে রেড নোটিশের আবেদনগুলো পাঠাই ইন্টারপোলের হেডকোয়ার্টারে। ইন্টারপোলের কাজ শেষ। এরপর ওটার প্রেক্ষিতে আরব আমিরাতের ইন্টারপোলের যে শাখা, তারা ওখানকার লোকাল পুলিশ, মানে দুবাই পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করেছে। এর আগেও তো আরব আমিরাত থেকে খুনের মামলার আসামি এলো। ওখানকার পুলিশ তারা অ্যারেস্ট করেছে, আমাদেরকে জানিয়েছে। আমাদের ওখান থেকে সিআইডি থেকে পুলিশ অফিসার গিয়ে বাংলাদেশে তাকে নিয়ে আসছে।’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকলেও কূটনৈতিক চ্যানেলে তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন প্রধান কৌঁসুলি। বাহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এক্সট্রাডিশন চুক্তি আরব আমিরাতের সঙ্গে নেই। ভারত ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে আছে। কিন্তু ওটা যে থাকতেই হবে, নট নেসেসারি। ওটা থাকলে ইজি হতো। কিন্তু দুই দেশের গভর্নমেন্ট পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমেই তাকে নিয়ে আসতে পারে।’

বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দুর্নীতির সব নথিপত্র গোছাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলে এই নথিগুলো দ্রুত পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম। গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, দুবাইতে গ্রেপ্তার হওয়া বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সব নথিপত্র তৈরির প্রস্তুতি চলছে। দুর্নীতির এসব নথিপত্র চূড়ান্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো হবে। কেননা, প্রমাণ শতভাগ সঠিক না হলে তাকে ফেরানো কঠিন হবে।

দুদকের তথ্যমতে, ৭৪ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চারটি মামলাসহ পাসপোর্ট জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিং মিলিয়ে বেনজীরের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলা রয়েছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর, বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ অঢেল সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দুবাইতে থাকা তার ফ্ল্যাটও জব্দ করেছে সংস্থাটি।

বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির। তার মতে, শক্তিশালী আইনি নথিপত্র, নির্ভুল তথ্য উপস্থাপন এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা নিশ্চিত করা গেলে বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব। গতকাল নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া :একটি সারসংক্ষেপ’ শিরোনামে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। শিশির মনির বলেন, বাংলাদেশ ও ইউএইর মধ্যে বর্তমানে কোনো কার্যকর দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) চুক্তি নেই। তবে ২০১৪ সালে দুই দেশের মধ্যে সই করা ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন সিকিউরিটি কো-অপারেশন’ এবং ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্রান্সফার অব সেন্টেন্সড প্রিজনার্স’ বিচারিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও বাংলাদেশের ‘এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট, ১৯৭৪’-এর ধারা ৪ অনুযায়ী সরকার চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে আইনের আওতায় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে পারে। ইউএইর আইনের অধীনে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তাব প্রস্তুত করবে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক চ্যানেলে তা পাঠাবে এবং বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) সার্বক্ষণিক সমন্বয় করবে।

শিশির মনিরের মতে, প্রত্যর্পণ আবেদন পাওয়ার পর ইউএইর আদালত কয়েকটি বিষয় যাচাই করবে। এর মধ্যে রয়েছে অভিযোগকৃত অপরাধ ইউএইর আইনেও অপরাধ কি না (ডুয়াল ক্রিমিনালিটি), মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না এবং বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার পর অভিযুক্ত ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ বিচার পাবেন কি না। অতীতের একটি সফল উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার আসামি মোহসিন মিয়া ও আরিফ সরকারকে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। যথাযথ নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতা থাকলে প্রত্যর্পণ সফল হওয়া সম্ভব।

Link copied!