প্রকাশিত: মার্চ ২১, ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম
রাতে হয়েছে ঝড়-বৃষ্টি। সকালেও আবহাওয়া ছিল মেঘলা। এর মধ্যেই আয়তনের দিক দিয়ে এশিয়ার অন্যতম বড় ঈদগাহ ময়দান দিনাজপুরের গোর-এ শহীদ ময়দানে হয়েছে ঈদের জামাত। এই জামাতে অংশগ্রহণ করেন লাখো মুসল্লি।
শনিবার সকাল ৯টায় ঈদের জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা মতিউর রহমান কাসেমী। নামাজে অংশগ্রহণ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ। ৫২ গম্বুজের ঈদগাহ মিনারের সামনের প্রায় ২২ একর আয়তনের ময়দানে নামাজ শেষে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় দোয়া ও মোনাজাত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা বড় ময়দানে নামাজ আদায় করতে আসেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নামাজ আদায় করে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।
সুষ্ঠুভাবে নামাজ উপযোগী করতে কয়েকদিন ধরেই রোলার দিয়ে সমান করা হয়েছে পুরো মাঠ। সবুজ ঘাসের উপর চুন দিয়ে নামাজের কাতারের দাগ কাটা হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মুসল্লিদের ওজুর ব্যবস্থাসহ সব ধরনের কাজ করা হয়। মাঠের চারপাশে তৈরি করা হয় ২০টি প্রবেশদ্বার, যাতে মুসল্লিরা নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে পারেন। নিরাপত্তা জোরদারে বসানো হয় তিনটি ওয়াচ টাওয়ার। সেখান থেকে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মাঠে প্রবেশের আগে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে মুসল্লিদের তল্লাশি করা হয়। পুরো মাঠটি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং করা হয়।
মাঠ ও আশেপাশের এলাকায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি কাতারেই ছিল সাদা বা সাধারণ পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও গোয়েন্দা সদস্যরা। ইমামের খুতবার বয়ান ও নামাজের শব্দ সবার কাছে পৌঁছে দিতে ছিল প্রায় ১০০টি মাইক।
উপশহর এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, ‘বড় জামাতে নামাজ পড়ে খুব ভালো লাগে। অনেক গর্ববোধ করি। অনেক মানুষের সাথে নামাজ আদায় করলাম। এখানে অনেক দূর থেকে মুসল্লিরা আসেন।’
দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আখতারুজ্জামান জুয়েল বলেন, ‘সকল মুসল্লির জন্য এই ঈদগাহ ময়দানে নামাজ আদায় করলাম। লাখ লাখ মুসল্লি থাকে। অবশ্যই আল্লাহ কারও না কারও দোয়া কবুল করবেন। ওই হাতের উসিলায় আমরা এখানে ছুটে আসি।’
ঈদগাহ আবাসিক এলাকার নাঈম হাসান বলেন, ‘আমাদের গোর-এ শহীদ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ মাঠ। ছোটবেলা থেকেই আমরা সকলে মিলে এই মাঠে নামাজ আদায় করি। আগে ছোট ছিল, এখন অনেক বড়। আমরা সবাই আনন্দিত।’
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কাপাসিয়া থেকে এসেছি, শুনেছি এখানে ৬ লাখ মানুষ হয়। আমি নিয়ত করেছিলাম, আমার আশা আল্লাহ কবুল করেছেন। নামাজ পড়ে এই মাঠ দেখলাম, সকলের সাথে নামাজ পড়লাম। আমার অনেক ভালো লেগেছে। এখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন।’
বগুড়া গাবতলী থেকে আসা জাবেদ আলী বলেন, ‘অনেক মানুষের সাথে নামাজ আদায় করলাম। খুব ভালো লেগেছে। এর আগেও এখানে নামাজ আদায় করেছি, এবারও এসেছি। বড় জামাতে নামাজ আদায় করলে সওয়াব বেশি।’
দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নামাজ আদায় হয়েছে। এখানে পুলিশ বাহিনীর বেশ সহযোগিতা ছিল, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো ছিল। নামাজের পরিবেশও ভালো ছিল। মুসল্লিদের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা ছিল।’
দিনাজপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গোর-এ শহীদ বড় ময়দানের আয়তন প্রায় ২২ একর। ২০১৭ সালে নির্মিত ৫২ গম্বুজের ঈদগাহ মিনার তৈরিতে খরচ হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ঈদগাহ মাঠটি ঐতিহাসিক নিদর্শন ও মনোরম কৃতির সৌন্দর্য ও নান্দনিক হিসেবে নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। এই ৫০ গম্বুজের দুই ধারে ৬০ ফুট করে ২টি মিনার, মাঝের দুটি মিনার ৫০ ফুট করে। ঈদগাহ মাঠের মিনারের প্রথম গম্বুজ অর্থাৎ মেহেরাব (যেখানে ইমাম দাঁড়াবেন) তার উচ্চতা ৪৭ ফিট। এর সাথে রয়েছে আরও ৪৯টি গম্বুজ। এছাড়া ৫১৬ ফিট লম্বায় ৩২টি আর্চ নির্মাণ করা হয়েছে। উপমহাদেশে এত বড় ঈদগাহ মাঠ দ্বিতীয়টি নেই। পুরো মিনার সিরামিক্স দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি গম্বুজ ও মিনারে রয়েছে বৈদ্যুতিক লাইটিং। রাত হলে ঈদগাহ মিনার আলোকিত হয়ে উঠে। ২০১৭ সাল থেকেই প্রতিবার এখানে ঈদের নামাজ আদায় করছেন দিনাজপুর জেলাসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা-উপজেলার মুসল্লিরা।
আপনার মতামত লিখুন :