প্রকাশিত: মার্চ ২৩, ২০২৬, ১২:১২ পিএম
ফ্রান্সের ২০২৬ সালের পৌর নির্বাচনে চার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছেন। দেশটির বিভিন্ন শহরে তাদের এই সাফল্য প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য গর্বের পাশাপাশি ফরাসি মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের শক্ত বার্তা দিয়েছে।
প্রথম দফার ভোটে গত ১৫ মার্চ সাঁ-দেনি থেকে নাহিদুল ইসলাম বিজয়ী হন। দ্বিতীয় দফার ভোটে রবিবার (২২ মার্চ) জয়ী হয়েছেন কৌশিক রাব্বানী স্থা শহর থেকে, ফাহিম মোহাম্মদ ক্রেতেই শহর থেকে এবং জুবায়েদ আহমেদ ইভ্রি-সুর-সেন থেকে।
নির্বাচিতদের মধ্যে সাঁ-দেনির নাহিদুল ইসলাম বামপন্থী লা ফ্রঁস আঁসুমিজ (এলএফআই) সমর্থিত প্যানেল থেকে জয় পেয়ে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছেন।
একই সঙ্গে কৌশিক রাব্বানী খান পুনরায় নির্বাচিত হয়ে তার দীর্ঘদিনের কমিউনিটি সম্পৃক্ততার স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ফরাসি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং কমিউনিটিতে বিভিন্ন প্রশাসনিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তিনি কমিউনিটিতে বেশ সুপরিচিত। গতবারের মতো এই নির্বাচনেও তিনি বর্তমান মেয়র আজেদিন তাইবির প্যানেল থেকে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
২৫ বছর বয়সী তরুণ ফাহিম মোহাম্মদের জীবন সংগ্রাম বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। শৈশবে ফ্রান্সে এসে একসময় অনিয়মিত অবস্থায় পড়লেও পরবর্তীতে দাবায় সাফল্যের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন। সেই সূত্রে বৈধতা পেয়ে বর্তমানে তিনি একজন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টির (পিএস) প্যানেল থেকে ক্রেতেই শহরে তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।
ইভ্রি-সুর-সেন শহর থেকে প্রথমবারের মতো জনপ্রতিনিধি হয়েছেন তরুণ ক্রিকেটার জুবায়েদ আহমেদ। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ফিলিপ বয়ুসু নেতৃত্বাধীন ফ্রন্ট পপুলেয়ার দলের প্যানেল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
এবারের নির্বাচনে আরো কয়েকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী অংশ নিলেও তারা জয়ী হতে পারেননি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে।
জাতীয় রাজনীতির চিত্র
গতকাল রবিবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার ভোটের ফলাফলে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গণে স্পষ্ট বিভাজন ফুটে উঠেছে।
বড় শহরগুলোতে বামপন্থীরা তাদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন, অন্যদিকে ডানপন্থীরা ও কট্টর ডান দলগুলোও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
প্যারিসে বাম জোটের প্রার্থী এমানুয়েল গ্রেগোয়া ৫০.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিদা দাতি পেয়েছেন ৪১.৪ শতাংশ ভোট। লিয়ঁ শহরে গ্রেগরি দুশে এবং মার্সেইতে বনুয়া পায়ো পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
নঁত ও রেন শহরেও বামপন্থী প্রার্থীরা জয় ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে তুলুজ ও লিমোজ শহরে ডানপন্থীরা তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন এবং বেজঁসোঁ শহর দীর্ঘদিন পর বামদের কাছ থেকে দখল করেছে। কট্টর ডান ন্যাশনাল র্যালি (আরএন) কিছু শহরে ব্যর্থ হলেও নিস শহরে এরিক সিওত্তির নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। অতি বাম দল এলএফআই রুবেই শহরে জয় পেলেও সব জায়গায় তাদের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে পারেনি।
ভোটার উপস্থিতি ও নির্বাচন পদ্ধতি
এবারের নির্বাচনে প্রায় ৫৭ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করেছেন, যা ২০২০ সালের তুলনায় বেশি।
ফ্রান্সের পৌরসভা নির্বাচনে সরাসরি কাউন্সিলর নির্বাচন হয় না। ভোটাররা মেয়র প্রার্থীর নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা প্যানেলের পক্ষে ভোট দেন। প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সেই তালিকা থেকে কাউন্সিলররা নির্বাচিত হন এবং পরে নির্বাচিত কাউন্সিলররাই নিজেদের মধ্য থেকে মেয়র নির্বাচন করেন। সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন দেখিয়েছে, ফ্রান্সের রাজনীতিতে বাম, ডান ও কট্টর ডান—এই তিন ধারার প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন তীব্র হচ্ছে, তেমনি অভিবাসী পটভূমির নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণও দৃশ্যমানভাবে বাড়ছে।
আপনার মতামত লিখুন :