ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২
amaderkhobor24.com

ভাঙচুরের দেড় বছর পরও বন্ধ স্বাধীনতা জাদুঘর

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২৬, ০৯:১৬ এএম

ভাঙচুরের দেড় বছর পরও বন্ধ স্বাধীনতা জাদুঘর

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা জাদুঘর। ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের ৪৪তম স্বাধীনতা দিবসে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এটি। তবে ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসে তালাবদ্ধ থাকছে এই জাদুঘর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে সেদিন একদল বিক্ষুব্ধ জনতা ব্যাপক আকারে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় ভূগর্ভস্থ এই জাদুঘরে। তারপর থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের এই প্রতিষ্ঠান।

ভাঙচুর ও লুটপাটের পর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকা এই জাদুঘর কবে আবার সবার জন্য উন্মুক্ত হবে তা এখনও অনেকটাই অনিশ্চিত। যদিও কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এই বছরের মে-জুন মাসের মধ্যেই আবার খুলে দেওয়া হবে জাদুঘরটি।

 

সরেজমিন দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত জাদুঘরের প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। নেই কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি। চারপাশে নীরবতা, নেই কোনও দর্শনার্থীর আনাগোনা। ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’ লেখা কাঁচের নামফলকটি আর নেই দেয়ালে। জাদুঘরের প্রবেশমুখে যে র‍্যাম্পটি ছিল, সেটি ইটের ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। জাদুঘরের দেয়ালে লেখা রয়েছে ‘জেন-জি ওয়ান্টস খিলাফাহ’।

 

ভাঙচুরের পর অনেকটা অযত্নেই রয়েছে এই জাতীয় স্থাপনাটি। হামলার সময় জাদুঘরের বাইরের দেয়ালে থাকা টেরাকোটাগুলো ভেঙে ফেলা হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের মুখাবয়বগুলো ভেঙে ফেলা হয়। সেই টেরাকোটার ভাঙা অংশগুলো দেড় বছরের বেশি সময় পরেও এখনও সেভাবেই পড়ে রয়েছে সেখানে। সামনে থাকা ওয়াটার বডির পানিতেও জমে আছে আবর্জনা। যা অযত্নেরই লক্ষণ বলছেন অনেকে।

ভাঙচুরের দেড় বছর পরও বন্ধ স্বাধীনতা জাদুঘর

 

নিয়মিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুরতে যাওয়া এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাজধানীতে পর্যাপ্ত বিনোদন কেন্দ্র নেই। স্বাধীনতা জাদুঘর ও আশপাশের এলাকা সময় কাটানোর জন্য দারুণ স্থান। এখানে আমরা ইতিহাসও জানতে পারতাম এবং টেরাকোটার নজরকাড়া নকশায় মুগ্ধ হতাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে জাদুঘরটি বন্ধ। ভাঙা অংশগুলো এখনও সরানো হয়নি, যা অনেকটা অবহেলার পরিচয়।”

তিনি আরও বলেন, “এই জাদুঘর ভাঙচুর করে রাজাকারের বংশধররা স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে দিতে চেয়েছে। আমাদের জন্ম, ইতিহাস, গর্ব—সব কিছুতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ সরকারের কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। প্রায় দুই বছর ধরে জাদুঘর সংস্কার করা হয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধ তো কোনও এক দলের নয়, এটি সব বাঙালির। আমি চাই আগামী স্বাধীনতা দিবসের আগে জাদুঘর সংস্কার করে পুনরায় উন্মুক্ত করা হোক।”

ভাঙচুরের দেড় বছর পরও বন্ধ স্বাধীনতা জাদুঘর

স্বাধীনতা জাদুঘরের সামনে দায়িত্বরত আনসার সদস্য বলেন, “এটা বন্ধ অনির্দিষ্টকালের জন্য। ৫ আগস্টের পর থেকেই এটা বন্ধ। এটার ভিতরে কিছু নাই এখন। সব ভেঙে ফেলছে। তারপর থেকেই এটা তালাবদ্ধ। কেউ এখানে আর আসে না।”

তিনি আরও বলেন, “আমি প্রায় ৭/৮ মাস ধরে এখানে ডিউটিতে আছি। বসে থাকি। আমাকে কর্তৃপক্ষ থেকে বলা আছে, কেউ তালা ভাঙতে এলে বা কোনও কিছু ভাঙচুর করতে এলে ফোন দিয়ে জানাতে। আমি শুধু ফোন দিয়ে জানাবো, তারপর তারা ব্যবস্থা নেবে।”

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে নতুন সরকারের কাছ থেকে অন্তত একটি নীতিগত অবস্থান বা পলিসি স্টেটমেন্ট প্রত্যাশা করা যায়। হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণ সম্ভব নাও হতে পারে, তবে বিষয়টি গুরুত্ব দাবি করে। নতুন সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাই এই বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বিগত সরকারের অবস্থানও এটার মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন দেশের দিকে তাকিয়ে সামনের পরিকল্পনা করতে হবে।”

জাদুঘরের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, “নামফলক নেই, বাইরের ম্যুরাল বা টেরাকোটাগুলো ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। এটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত বিভাগ এবং জাতীয় জাদুঘরের সমন্বিত দায়িত্বে, তবে সবশেষে সমন্বয়ের দায়িত্ব সরকারের। তাই সরকারের সুস্পষ্ট বিবৃতি প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “এখন সবচেয়ে জরুরি হলো ক্ষতিগ্রস্ত জাদুঘরের ক্ষত উপশম। তারপর ক্ষতিপূরণ। আশা করি সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন।”

ভাঙচুরকে সুপরিকল্পিত আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এটি কোনও সাধারণ মবের কাজ ছিল না। এটি একটি ভূগর্ভস্থ জাদুঘর, যা সবার চলাচলের পথের বাইরে। একটি গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে এটি ধ্বংস করেছে। একটি জাতির প্রতীককে তারা নষ্ট করতে চেয়েছে। তাই সরকারি তদন্ত হওয়া উচিত এবং দায়ীদের শনাক্ত করা সম্ভব।”

জাদুঘর খোলার পরিকল্পনা বিষয়ে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব বলেন, “নতুন কনটেন্ট সাজানো নিয়ে কাজ চলছে। আশা করি এ বছরের মে-জুনের দিকে জাদুঘর পুনরায় খুলতে পারবো। আর্কিটেক্টরা ডিজাইন নিয়ে কাজ করছেন। ভাঙচুর যেসব হয়েছে, সেগুলো নতুনভাবে প্রোডাকশন করা হচ্ছে। অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেছে, আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব নয়। তবে সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে। এখন সম্পূর্ণ নতুনভাবে কিউরেশন করতে হবে, যা অন্তত দুই-তিন মাস সময় লাগবে।”

ভাঙচুরের ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, এখন পর্যন্ত আইনানুগ ব্যবস্থা নেই। আমরা মূলত বড় ধরনের অ্যাসেসমেন্ট করেছি—কী ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো।”

Link copied!