একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে তীব্র লোডশেডিং; তার সঙ্গে এক মাসের বেশি সময় ধরে ডিজেল সংকট—এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জেলায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। দিনে-রাতে সমানতালে লোডশেডিংয়ের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে জীবনযাত্রা। বিশেষ করে চলতি বোরো মৌসুমে সেচ কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দাম বাড়লেও মিলছে না পর্যাপ্ত ডিজেল। জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ে অচল বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার সেচ পাম্প। এ অবস্থায় বোরো আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষকরা বলছেন, দাম বাড়লেও কাটেনি ডিজেল সংকট। ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদামাফিক ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটার প্রতি ১৫-২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়। এ অবস্থায় হাজার হাজার ডিজেলচালিত সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে আছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় বিঘা প্রতি সেচ খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় ইলেকট্রিক পাম্পগুলো চালানো যাচ্ছে না। ধান গাছের ফুল আসা ও দানা বাঁধার সময়ে সেচ দিতে না পারলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসবে।
রাজশাহীর পাম্পগুলোতে শ্যালোমেশিন নিয়ে আসছেন চাষিরা
রাজশাহীতে তেলের পাম্প আছে ৪৬টি। এর মধ্যে প্রতিদিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০টিতে। বাকিগুলো থাকছে বন্ধ। যেগুলো পাম্পে তেল বিক্রি হচ্ছে সেগুলোতেও দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ রাত থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। আবার কৃষকরাও তেল নিতে না পেরে সেচ দিতে পারছেন না।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাম্পগুলোতে বোরো চাষিরা তেল নিতে শ্যালোমেশিন নিয়ে আসছেন। বালানগর, কালচিকার বোরো চাষি কালাম ও কোরবান আলী জানান, পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় বাড়িতে পানি তোলা মোটর চালিয়ে জমিতে সেচ দিতে হয়। কোনও কোনও সময় জমিতে পাইপ বিছানোর পরে দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ নেই। এ অবস্থায় সেচ দিতে না পারলে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রাজশাহী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো মাঠে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থার ওপরও। কারণ জেলার অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার সেচ পাম্প অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
মাথায় করে শ্যালোমেশিন (সেচযন্ত্র) নিয়ে পাম্পে এসেছেন রাকিব হোসেন। তিনি জানান, ফিলিং স্টেশন থেকে ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। এই তেলে খুব বেশি তিন ঘণ্টা মেশিন চলবে। আমার জমিতে ৯ ঘণ্টা পানি লাগে। যেহেতু তেল পাওয়া যাচ্ছে না, তাই এভাবে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে তেল কিনে সেচ দিতে হচ্ছে। যারা বোরো ধানের জমিতে সেচ দেবে তাদের কমপক্ষে ৪০০-৫০০ টাকার দিলে ভালো হয়।
পদ্মা অয়েল কোম্পানির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আগে পাম্পগুলোতে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হতো, এখনও কাছাকাছি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। সে কারণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এ সংকটের কারণে বিপিসি দৌলতপুর থেকে তেল দিতে পারছে না। আমরাও আর ওয়াগনের সুবিধা কাজে লাগাতে পারছি না। এখন ডিলারদের তিনগুণ ব্যয়ে সড়কপথে তেল আনতে হচ্ছে।’
কক্সবাজারে অচল ৪ হাজার সেচ পাম্প
চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ার পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না। অনেক স্থানে ধান গাছের জমি শুকিয়ে গেছে। এ অবস্থায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেলের অভাবে জেলার প্রায় সব সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে পড়েছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন, ডিজেল সংকটের পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না। এতে চার হাজারের বেশি সেচ পাম্প অচল হয়ে পড়েছে। বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে। সবচেয়ে চকরিয়া উপজেলায় পরিস্থিতি নাজুক। অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন তেল বিক্রি সীমিত করে দেওয়ায় সেচ পাম্প মালিকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে। ফলে কৃষিতে স্থবিরতা দেখা দেয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, টেকনাফ, উখিয়া, রামু, ঈদগাঁও, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও সদর উপজেলায় সেচপাম্প আছে সাত হাজার ১৪৬টি। এর মধ্যে ৫-২০ ঘোড়ার গভীর পাম্প ১০টি, ১-৫ ঘোড়ার শ্যালো পাম্প চার হাজার ৮৫২টি এবং ৫-১০ ঘোড়ার এলএলপি (লো লিপ পাম্প) আছে দুই হাজার ২৮৪টি। ৭০ শতাংশ পাম্প ডিজেলচালিত, অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ ও ডিজেল দুটো দিয়ে চলে। কিন্তু জ্বালানি সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো পাম্প চালানো যাচ্ছে না।
উপজেলাভিত্তিক কৃষি সমিতির নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, ডিজেল সংকটের কারণে বর্তমানে চার হাজার ২০০টির বেশি সেচ পাম্প বন্ধ আছে। এর ফলে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে ঠিকমতো পানি সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জেলায় এবার বোরো ধানের চাষ হচ্ছে ৫৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে।
উখিয়ার সোনাইছড়ি এলাকার কৃষক মোক্তার মিয়া, নুরুল আমিন, আবুল খায়ের জানান, সময়মতো সেচ দিতে না পারলে ধানের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারা।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় অর্ধেকের বেশি পাম্প ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। তাতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে চাষিরা আমাদের জানিয়েছেন। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’
দুশ্চিন্তায় বরিশালের বোরো চাষিরা
বরিশাল অঞ্চলের প্রায় চার লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের সেচ নিয়ে উদ্বেগে আছেন কৃষকরা। একইসঙ্গে মাঠে থাকা তরমুজ নিয়েও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। দাম বাড়লেও তেল পাচ্ছেন না, সেচও দিতে পারছেন না।
চলতি রবি মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে তিন লাখ ৮৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ টন চাল উৎপাদনের। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ রোপণ সম্পন্ন হলেও এখন ধান গাছে থোর ও ফুল আসার স্পর্শকাতর সময়ে সেচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা। একদিকে বৃষ্টির অপেক্ষা করছেন, অন্যদিকে ডিজেলের অনিশ্চয়তায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ৮৭ হাজার সেচ পাম্প চালু রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭৪ হাজারই ডিজেলচালিত। এসব পাম্প চালাতে প্রতিদিন গড়ে ৫ লাখ লিটারের বেশি ডিজেল প্রয়োজন। ফলে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার কারণে বেশিরভাগই অচল হয়ে পড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, আগামী ১৫ মে পর্যন্ত বোরো ক্ষেতে নিরবচ্ছিন্ন সেচ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বরিশাল অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, ‘বোরো আবাদে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও বৃষ্টির ঘাটতি ও ডিজেল নির্ভরতা সেচ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি সেচ কার্যক্রম সচল রাখতে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত শুরু হলে সেচ ব্যয় কমে আসবে এবং কৃষকরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।’
জামালপুরে সেচ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে কৃষক
জামালপুরে প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ ও সেচকাজ। সরেজমিনে পাম্পগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, ডিজেল নিতে কৃষকদের দীর্ঘ সারি। কারও হাতে তেল নেওয়ার ক্যান বা বোতল, আবার কেউ শ্যালো মেশিনের ফুয়েল ট্যাংক নিয়ে অপেক্ষা করছেন। ফজর নামাজের পর থেকেই লাইনে দাঁড়াতে দেখা যায় কৃষকদের। ডিজেল না থাকায় গত কয়েকদিন থেকে বন্ধ রয়েছে ডিজেলচালিত অধিকাংশ সেচ পাম্প। পানির অভাবে জমির মাটি শুকিয়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় ধানের চারা লালচে হয়ে মরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে মাঠের এই ফাটল কেবল মাটির নয়, বরং কৃষকের বুকচেরা হাহাকার।
স্থানীয় কার্ডধারী কৃষক আজমত আলী, দিদার আলী, মোফাজ্জল হকসহ একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, এখন আমাদের শষ্যমাঠে কৃষিকাজের ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। জমি চাষ, সেচ এবং কৃষিযন্ত্র চালাতে ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তেলের সংকটে শাকসবজি, পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা ও ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র, পাওয়ার টিলার, ধান কাটার মেশিন ও ট্রাক্টর বন্ধ থাকায় অনেক জমির কাজ করতে পাচ্ছি না। কয়েকদিন ধরেই কৃষিকার্ড নিয়ে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরেও প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছি না। ভোররাত থেকে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক সময় তেল না পাওয়ায় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
নূরজাহান ফিলিং স্টেশনের মালিক মো. সুমন মিয়া বলেন, ‘আমরা সাড়ে ৪ হাজার লিটার ডিজেল পেয়েছি, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এই ডিজেল ট্রাক, বাস, বিভিন্ন যানবাহন ও কৃষকদের দেওয়া হয়।’
সরিষাবাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার অনুপ সিংহ জানান, সব কৃষককে ফুয়েল কার্ডের জন্য কৃষি অফিসে আবেদন করতে বলা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ২ শতাধিক কৃষক আবেদন করেছেন। ডিজেল সংকটের কারণে কৃষি খাতে সেচ প্রকল্প, ট্রাক্টর ও অন্যান্য মেশিনারিজ যন্ত্র চালানোর জন্য ডিজেল প্রয়োজন। সামনে ডিজেলের প্রয়োজন আরও বেশি হবে, চাপ পড়বে। আশা করি ডিজেলের সমস্যা অতি দ্রুত সমাধান হবে।
একই অবস্থা ময়মনসিংহেও
জ্বালানি সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের কৃষিখাতে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচনির্ভর কৃষিতে দেখা দিয়েছে চরম ভোগান্তি। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে ফসল উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
হালুয়াঘাট, তারাকান্দা, ধোবাউড়া, ফুলবাড়ীয়া, গফরগাঁও, নান্দাইলসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ সেচ পাম্প বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। ডিজেল না পাওয়ায় সেচ পাম্প বন্ধ রাখতে হয় আবার লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুৎচালিতগুলোও বন্ধ থাকে।
হালুয়াঘাটের আব্দুল করিম জানান, আগে দিনে ২-৩ বার পানি দিতে পারতাম, এখন বিদ্যুৎ না থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। ডিজেল দিয়ে সেচ দিতে গিয়ে খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। ঠিকমতো তেলও পাওয়া যায় না।
নান্দাইলের একাধিক সেচ পাম্প মালিক জানান, দিনে ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় রাত জেগে বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বোরো ধানের জন্য নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক জমিতে সেচ দিতে বিলম্ব হচ্ছে, যা ফলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চট্টগ্রামে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে জ্বালানি তেলের সংকটে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় আখ, কলা, বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং ড্রাগন ফলের বাগানসহ জমির ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। সেচ পাম্প চালানোর মতো ডিজেল না থাকায় নদীর পাড় ঘেঁষা জমিতেও পানি দিতে পারছেন না কৃষকরা।
উপজেলার নাছির মোহাম্মদ ঘাট এলাকায় দেখা গেছে, তীব্র রোদে আখ ও সবজির পাতা শুকিয়ে গেছে। অনেক গাছ কচি অবস্থাতেই নেতিয়ে পড়ছে। পাশে হালদা নদী থাকলেও তেলের অভাবে সেচ পাম্প বন্ধ পড়ে আছে।
স্থানীয় কৃষক মো. সোহেল বলেন, ধারদেনা করে আখ চাষ করেছি। পাশেই নদী কিন্তু তেল না থাকায় পাম্প চালাতে পারছি না। চোখের সামনে ফসলগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা কৃষক মিজানুর রহমানের। কৃষি অফিসের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে পাম্পে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাননি তিনি।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম তাই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান ফটিকছড়ি সুন্দর অয়েল ফিলিং স্টেশন ম্যানেজার আবুল মুনছুর। যেখানে প্রতিদিন ৯ থেকে ১০ হাজার লিটার ডিজেল দরকার, সেখানে এখন পাচ্ছি মাত্র সাড়ে ৪ হাজার লিটার।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের প্রভাব কৃষিতে পড়েছে। ধানের জমিতে সেচের চাপ আর ১০ দিনের মতো থাকতে পারে। এ সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। মাটি কাটার ট্রাকগুলো সামনের এক সপ্তাহ বন্ধ রাখলেও অসুবিধা নেই।’
গোপালগঞ্জে ব্যাহত হচ্ছে সেচকাজ
গোপালগঞ্জে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে ব্যাহত হচ্ছে কৃষি কার্যক্রম। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন বোরো ধান চাষিরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনগুলোতে দাঁড়িয়ে থেকেও সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় অনেক জমিতে সেচ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। যা নিয়ে চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় রয়েছেন কৃষকরা। এতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মো. মামুনুর রহমান, ‘জেলায় ডিজেলের সংকট এখনও কাটেনি। এখন বোরো মৌসুম চলছে। চলতি মৌসুমে গোপালগঞ্জে ৮২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। আর এখন জমিতে সেচ দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়। কোনও কৃষক যদি তেল না পায় তাহলে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।’
রংপুরে বোরো ক্ষেত ফেটে চৌচির
রংপুরে তীব্র জ্বালানি সংকটে কৃষিতে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ডিজেলের অভাবে প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে সেচ পাম্প। বোরো ধান ক্ষেত ফেটে চৌচির। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। জমিতে সময়মতো সেচ দিতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ। সংকট কাটাতে দ্রুত ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলেছেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন।
বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, ডিজেলের অভাবে অধিকাংশ সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে পড়েছে। সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। এতে ফসল নষ্টের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বলছেন, বোরো ধানের জমিতে নিয়মিত সেচ জরুরি। ডিজেল না থাকায় জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। আগে সহজেই ডিজেল পাওয়া গেলেও এখন ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না তারা। অনেক ক্ষেত্রে দুই-তিন লিটারের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না; যা দিয়ে কয়েক ঘণ্টাও সেচ চালানো সম্ভব নয়।
কৃষি বিভাগ বলছে, রংপুর অঞ্চলের বেশিরভাগ সেচ ব্যবস্থা ডিজেল নির্ভর। কিন্তু বর্তমান সংকটে সেচ কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এবার জেলায় এক লাখ ৩২ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কিন্তু ডিজেল সংকটে সেচ বন্ধ থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খুলনায় সেচ ব্যাহত
জ্বালানি তেলের সংকটে খুলনা অঞ্চলে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। এ সময়ে সেচ দিতে না পারলে ফলন অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা করছেন তারা।
ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের জালিয়ারডাঙ্গা গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান জানান, ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে সেচ দিতে পারছেন না। কারণ কোথাও জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না। একটি পেট্রোল পাম্পে কয়েকবার গেলেও সেখানে গাড়ি ছাড়া অন্য কোনও পাত্রে তেল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এই মুহূর্তে সেচ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এখন সেচ দিতে না পারলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।
খুলনা কৃষি অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বোরো ধান বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ জমিতে ধান চারা থেকে ছড়া তৈরির পর্যায়ে, মাত্র ৪ শতাংশ জমিতে ধান হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। বোরো আবাদে সমস্যা হবে না, ডিজেল সংকট থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে।
কুমিল্লায় কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
কুমিল্লার প্রতিটি উপজেলায় ফসলের মাঠে এখন বোরো ধান। এই সময়ে বিদ্যুতের সংকট কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে অধিকাংশ সেচপাম্প দিন ও রাতের বড় একটা সময় বন্ধ থাকছে। দেবীদ্বারের জাফরগঞ্জ এলাকার কৃষক মোতালেব মিয়া বলেন, ধানের শিষ বের হয়েছে কয়েক দিন আগে; এই সময়ে জমিতে নিয়মিত পানি প্রয়োজন, কিন্তু বিদ্যুৎ যায় তো আর আসে না। অনেকের জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, এতে ফলন অনেক কমে যাওয়ার ভয় করছেন। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
বুড়িচং উপজেলার ভান্তি এলাকায় বিদ্যুতে চালিত একটি সেচপাম্পের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা আমরা বিদ্যুৎ পাই না। আমাদের এই পাম্প দিয়ে গোমতী নদী থেকে মানুষের জমিতে সেচ দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো মানুষের বোরো ধানের জমিতে সেচ দিতে পারছি না। প্রতিদিনই মানুষের কথা শুনতে হচ্ছে। কী যে দুর্ভোগে আছি।’
মুন্সীগঞ্জে সেচের অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের চারা
মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার ধামারণ গ্রামের কৃষক শামসু মোল্লা জানান, ডিজেল সংকটে বোরো ধানের জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। পুরো পরিশ্রম বৃথা যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে তার। দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন।
একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন সদর উপজেলার চরাঞ্চলের ধান চাষি মানিক মিয়া। তার ভাষ্য, জ্বালানি তেল না থাকায় সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না। ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি সেচ দিতে না পারেন, তাহলে সব ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, চলমান তেল সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যেবক্ষণ করছেন তারা। বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখা জরুরি, কারণ এই সময় পানি সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও ফসলের উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।