ঢাকা সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩
amaderkhobor24.com

তিন বছরে ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম

তিন বছরে ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে

বৈশ্বিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা কারণে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে; আরও বহু কারখানা আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দেশের পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট প্রস্তাবে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় বাজেট প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করেন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। এ সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান ও অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। 

সভায় দুই সংগঠনই জানিয়েছে, পোশাক শিল্প বর্তমানে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজেট প্রস্তাবে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে গত বছরের আগস্ট থেকে রপ্তানি আয়ের এই নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে কারখানাগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শিল্পের এই স্থবিরতার পেছনে কিছু কারণ উল্লেখ করেছে বিজিএমইএ। সংগঠনটি বলেছে, গত সাত মাসে বস্ত্র ও পোশাক খাতে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি যথাক্রমে ৩৭ দশমিক ৮৭ ও ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে। ঋণের সুদের হার ১২ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এ ছাড়া গত কয়েক বছরে গ্যাসের দাম ২৮৬ ও বিদ্যুতের দাম ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৪ সালে ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি এবং বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট কার্যকর হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ ৪১ শতাংশ বেড়েছে। অথচ ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ধাপে ধাপে রপ্তানি প্রণোদনা প্রায় ৬০ শতাংশ কমানো হয়, যা রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার পরিমাণ ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ কমেছে। বিশ্ববাজারে বিশেষ করে ইউরোপে চীনা পণ্যের আগ্রাসী মূল্যহ্রাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমেছে। সামনে ইইউ জিএসপি প্লাস চ্যালেঞ্জ এবং ‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর বাস্তবায়ন শিল্পের ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে।

বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, সংকটময় এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়িক ব্যয় কমানো এবং নীতিমালার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে শিল্পের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। এ জন্য আগামী বাজেটে নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ আয়কর কর্তন থেকে অব্যাহতি ও রপ্তানির বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ নির্ধারণ করে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করে পাঁচ বছর পর্যন্ত কার্যকর রাখার দাবি জানান তিনি। 

মাহমুদ হাসান খান বলেন, প্রত্যক্ষ রপ্তানিকারকের কাছ থেকে প্রত্যাবাসিত রপ্তানি মূল্যের ওপর ১ শতাংশ উৎসে কর কর্তন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সাব-কন্ট্রাক্টের বিপরীতে উৎসে কর কর্তন হলে তা দ্বৈত করের আওতায় পড়বে। এর থেকে অব্যাহতি চান তিনি। 

বিজিএমইএর মতো একই ধরনের সংকটের চিত্র তুলে ধরেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের তুলনায় নিট পোশাক 
রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। গত বছর টানা রপ্তানি কমছে। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ ও করের বোঝা বাড়ছে। এতে কারখানাগুলো রুগ্‌ণ হয়ে পড়ছে। 

তিনি বলেন, রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি নতুন ক্রয়াদেশ কমে গেছে। এ খাতে নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। এর মধ্যে এআইটি হিসেবে কর কেটে নিলেও পরে তার সমন্বয় হচ্ছে না। বিনিয়োগ পরিবেশের ঘাটতি থাকায় এ খাতে স্থবিরতা নেমে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে উৎসে কর আগামী পাঁচ বছরের জন্য শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা দরকার। এ ছাড়া সাব-কন্ট্রাক্ট আয় ও অগ্রহণযোগ্য খরচের ওপর ৩০ এর পরিবর্তে ১২ শতাংশ করপোরেট কর নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি।  

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তুর চাহিদা বিবেচনায় সব ধরনের কৃত্রিম তন্তু আমদানিতে ভ্যাট ও শুল্ক প্রত্যাহার করা দরকার। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের স্বার্থে এবং দেশীয় ঝুট থেকে উৎপাদিত রিসাইকেল্ড ফাইবার বা সুতার ওপর থেকেও সব ধরনের ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি। 

রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ সহায়তার বিপরীতে ৫ শতাংশ কর প্রত্যাহার এবং বস্ত্র খাতের বিভিন্ন আইনি ও পদ্ধতিগত জটিলতা নিরসনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। সংগঠনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, তন্তু থেকে উৎপাদিত সুতা বিক্রির ওপর বর্তমানে বিদ্যমান বিভিন্ন হারের ভ্যাট কমিয়ে কেজিপ্রতি ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর নির্ধারণ ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ম্যান-মেড ফাইবারের কাপড়ের ওপর ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা দরকার। 

সভায় টেরিটাওয়েল উৎপাদন ও রপ্তাকিারক সংগঠনের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন এনবিআরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, ঘুষ নেওয়া বন্ধ হলে সরকারকে সব ধরনের শুল্ক-কর দেবেন ব্যবসায়ীরা। কোনো কিছু কমানোর আবেদন করবেন না। ব্যবসায়ীদের এসব দাবির প্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।

সভায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বিভিন্ন অঞ্চলের নীতিতে বিভিন্ন ধরনের অসংগতি আছে বলে মন্তব্য করেন সংস্থাটির নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। তিনি বলেন, বেজা, বেপজা ও হাই-টেক পার্কগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। অপটিক্যাল ফাইবার, ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) ও বিজনেস প্রসেসিংয়ের মতো উদীয়মান খাতগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া ফ্রি ট্রেড জোনকেও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

Link copied!