২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে নিহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বলছে, তিনটি স্পটে মোট ৫৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য তারা পেয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ওই ঘটনাকে ঘিরে বছরজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চললেও চব্বিশের গণআন্দোলনের পর পাল্টে যায় প্রেক্ষাপট। সমাবেশে হত্যা ও গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়ার পর শুরু হয় তদন্ত কার্যক্রম।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শাপলা চত্বরের ঘটনাটির তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে। এখন পর্যন্ত ঢাকায় ৩২ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে আসা একটি অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সেদিনের হামলা দিনে ও রাতে—দু’দফায় সংঘটিত হয় এবং ঢাকায় উভয় সময়েই অভিযান চালানো হয়। এতে ঢাকায় নিহত ৩২ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি জানান, হামলা ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পরদিন নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামেও হামলা চালিয়ে আরও ২৫ জনকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে তিনটি স্থানে ৫৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য পেয়েছে প্রসিকিউশন।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ঢাকার ৩২ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও বাকি ২৫ জনের পরিচয় নিশ্চিতের কাজ চলছে। এ ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ প্রায় ৩০ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আরও সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, প্রায় ১৩ বছর আগে হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। ব্লগারদের দ্বারা ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ ও নারী নীতির বিরোধিতাসহ বিভিন্ন দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে দিনভর রাজধানীজুড়ে উত্তেজনা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ওই দিন রাতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সম্মিলিত অভিযানে শাপলা চত্বর এলাকা জনশূন্য করা হয়।
শাপলা চত্বরের ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম অভিযোগটি দাখিল করা হয় মুফতি হারুন ইজহারের পক্ষে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জোরালো হয়। একই বছরের ২৬ নভেম্বর হেফাজতে ইসলামের নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ট্রাইব্যুনালে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। ওই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জন নামধারী এবং অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়।
বর্তমানে এই অভিযোগের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা নিহতদের পরিচয় শনাক্ত ও ঘটনার বিস্তারিত তথ্য উদঘাটনে কাজ করে যাচ্ছে।
অভিযুক্ত ও গ্রেফতার
শাপলা চত্বরের ঘটনায় পৃথক দুটি অভিযোগের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন—সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির ও সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল।
এছাড়াও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও হাসান মাহমুদ খন্দকার এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারকেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।
একই হামলার ঘটনার সময় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের সম্পৃক্ততা নিয়ে শুরুতে দ্বিধার কথা জানিয়েছিল প্রসিকিউশন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানানো হয়। তবে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে দেশজুড়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় পাঁচ বছরের সাজা নিয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন তিনি। সাবেক এই আইজিপি ওই মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিও দিয়েছেন।
এদিকে, ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ৭১ টেলিভিশন ও মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল এবং টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মোস্তফার বিরুদ্ধেও ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করেন হেফাজত নেতা মুশফিকুর রহমান। তাদের বিরুদ্ধে ওই সমাবেশে ‘গণহত্যায় উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
শাপলা চত্বরের এই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ট্রাইব্যুনাল আগামী ৭ জুন দিন ধার্য করেছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল প্রসিকিউশনকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।