দেশে বা বিদেশে সঠিক, পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদনের অভাবে বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে তার প্রকৃত ও সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৪তম দিন বুধবার (২৪ জুন) বিকেলে লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন লিখিত প্রশ্ন টেবিলে উত্থাপিত হয়।
বিকেল তিনটায় শুরু হওয়া জাতীয় সংসদের বৈঠকে এ পর্যায়ে সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
নেত্রকোনা-৫ সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার লিখিত প্রশ্নে জানতে চান, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে অবৈধভাবে পাচারকৃত টাকার মোট পরিমাণ কত? কী পরিমাণ টাকা ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং তা কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে?
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বিভিন্ন জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করে বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকে এবং এ বিষয়ে দেশে বা বিদেশে সঠিক, পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদনের অভাবে বাংলাদেশ থেকে কি পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে তার প্রকৃত ও সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন। তবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১.৮ লাখ কোটি টাকা)। এ অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ বাংলাদেশের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জিডিপির ৩.৪ শতাংশ, রফতানি ও রেমিট্যান্স আয়ের এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ, বাংলাদেশের জাতীয় সঞ্চয়ের প্রায় ১১.২ শতাংশ, নীট বৈদেশিক সহায়তা এবং এফডিআই প্রবাহের প্রায় দ্বিগুণ।
অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকারের সম্ভাব্য সব পদক্ষেপের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী
১. বাংলাদেশ হতে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এর সভাপতিত্বে ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর আওতায় ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেইস চিহ্নিত করা হয়। কেইসগুলো হলো– সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, নাবিল গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল এবং সামিট গ্রুপ।
এসব মামলাসমূহ অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে এবং বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম (জেআইটি) গঠন করা হয়। জেআইটি গঠনের পর ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেইসের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক মে ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭৬ হাজার ৮ শত ১৪ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
দেশের আদালত কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকুয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪২টি মামলা রুজু করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ০৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে।
২. বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স এবং যৌথ তদন্ত দলের সমন্বয় কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে বিএফআইইউ এর অধীনে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন গঠন করা হয়েছে। এছাড়া, পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম দক্ষ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের অনুসরণে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত সংস্থা গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
৩. বিদেশে অবৈধভাবে পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদেশী রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে পরামর্শ, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি-করাপশন কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (আইএসিসিসি), স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি (স্টার), বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি (স্টার) ইনিশিয়েটিভ, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাসেট রিকভারি (আইসিএআর), যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ইউএসডিওজে)। এছাড়া পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে কার্যকর তথ্য বিনিময়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশ গ্লোবাল অপারেশনাল নেটওয়ার্ক অব অ্যান্টি-করাপশন ল এনফোর্সমেন্ট অথরিটিজ (গ্লোবই নেটওয়ার্ক) এবং অ্যাসেট রিকভারি ইন্টারএজেন্সি নেটওয়ার্ক–এশিয়া প্যাসিফিক (এরিন-এপি)-এর সদস্যপদ অর্জন করেছে।
৪. ফৌজদারি (ক্রিমিনাল) মামলার পাশাপাশি দেওয়ানী (সিভিল) পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিতে খেলাপি ঋণের টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক তাদের ঋণের অর্থ উদ্ধারের জন্য নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরপূর্বক ৯টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে ‘নো উইন, নো ফি’ শর্তে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি কেইসের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৬ টি কেইস (সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস. আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা এবং ওরিয়ন গ্রুপ) নিয়ে দেওয়ানী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃক অর্থ পুনরুদ্ধারের এ কার্যক্রম আরো সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা নেওয়া রয়েছে।