ঢাকা বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২
amaderkhobor24.com

বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে অপতথ্যের ‘বন্যা’, বেশির ভাগের উৎস ভারত

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম

বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে অপতথ্যের ‘বন্যা’, বেশির ভাগের উৎস ভারত

বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা হুমকির মধ্যে নিঃশব্দ বিপদ ডেকে আনছে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, সুসংগঠিত অপপ্রচারের এই ঢল ভোটারদের সিদ্ধান্তকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আর এই অপতথ্যের বড় অংশই আসছে প্রতিবেশী ভারত থেকে।

প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এই প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে৷ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সরকার তাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার

প্রযুক্তিগত কারসাজির মাত্রা এতটাই বেড়ে গেছে যে, মিথ্যা তথ্য শনাক্ত ও মোকাবিলা করার জন্য নির্বাচন কমিশন বিশেষ একটি ইউনিট গঠন করতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি অত্যাধুনিক ছবি ও ভিডিও। এসব সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গত জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার তুর্কের কাছে সাহায্য চেয়ে বলেছিলেন, নির্বাচন ঘিরে বিদেশি ও স্থানীয় উভয় মাধ্যম থেকে ‘অপতথ্যের বন্যা’ বয়ে যাচ্ছে।

‘হিন্দু গণহত্যা’ দাবির বাস্তবতা

অপপ্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার দাবি। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ ধর্মীয় সংখ্যালঘু, যাদের সিংহভাগ হিন্দু৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘হিন্দু গণহত্যা’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য পোস্ট ও ভিডিও।

বাংলাদেশ পুলিশের জানুয়ারিতে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশকে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট জানায়, তারা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত শুধু এক্স প্ল্যাটফর্মে ‘হিন্দু গণহত্যা’ দাবিতে এক লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে সাত লাখের বেশি পোস্ট ট্র্যাক করেছে।

সংস্থাটির প্রধান রাকিব নায়েক এএফপিকে জানান, এসব পোস্টের ৯০ শতাংশেরও বেশি করা হয়েছে ভারত থেকে৷ বাকি অংশ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ক্যানাডায় সক্রিয় হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্ক থেকে করা হয়েছে।

এআইয়ের ভয়ংকর ব্যবহার

এএফপির ফ্যাক্ট চেক টিম যেসব ভুয়া খবর খণ্ডন করেছে, তার মধ্যে কিছু উদাহরণ বিস্ময়কর৷ একটি এআই-জেনারেটেড ভিডিওতে দেখা যায় একজন নারী যার হাত নেই, তিনি আবেগের সাথে বিএনপিকে ভোট না দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছেন৷ অথচ এই নারীর কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই।

আরেকটি কৃত্রিম ভিডিওতে একজন হিন্দু নারী দাবি করছেন তাদের জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, না হলে ভারতে নির্বাসিত করা হবে।

ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে যে শত শত এআই-তৈরি ভিডিও ছড়িয়ে আছে, তার খুব কমই এআই সতর্কতা লেবেল দিয়ে চিহ্নিত।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডিজিটালি রাইটের প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলছেন, ‘আমরা আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ভুয়া তথ্য দেখছি৷’ বিনামূল্যে পাওয়া এআই টুলগুলো এখন এমন অত্যাধুনিক নকল তৈরি করতে পারে যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন বলে জানান তিনি।

অপতথ্যের বাস্তব প্রভাব

এই অপপ্রচারের প্রভাব ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ থাকেনি৷ ভারতে সোশ্যাল মিডিয়ায় হিন্দু মৌলবাদীদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে আইপিএল লিগে খেলার সুযোগ পাওয়া একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটারের চুক্তি বাতিল হয়।

তবে বিশ্লেষকরা স্পষ্ট করেছেন, এটা সরাসরি ভারত সরকার পরিচালনা করছে এমন প্রমাণ নেই।

নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে তারা ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বারবার হামলার একটি উদ্বেগজনক ধরন’ লক্ষ্য করেছে, তবে ‘স্বাধীন, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের’ পক্ষেও তাদের অবস্থান।

প্রযুক্তির সঙ্গে অসম লড়াই

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, তারা মেটার সঙ্গে সমন্বয় করছে এবং সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরের জন্য বিশেষ ইউনিট গঠন করেছে৷ তবে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন পোস্টের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া একটা অন্তহীন যুদ্ধ।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন তুলি মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য এআই-তথ্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ৷ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী শহরে ৮০ শতাংশ এবং গ্রামে ৭০ শতাংশ পরিবারের কাছে স্মার্টফোন থাকলেও অনেকেই এই প্রযুক্তিতে নতুন।

‘মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাই করার সচেতনতা এখনো গড়ে ওঠেনি,’ বলেন টুলি।

তথ্যসূত্র: ডয়েচে ভেলে

Link copied!