ঝিনাইদহ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
ঝিনাইদহের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়োগ ও সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ ঘিরে পাওয়া বিভিন্ন নথিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া, দরপত্রের শর্ত এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ফ্যাসিলিটি রেজিস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে ডা. মোস্তাফিজুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, গ্ল্যান্স সিকিউরিটি সার্ভিসেস ২০২৬ সালের ২৮ জুন শেখ মাজেদুর রহমানকে হাসপাতালের আউটসোর্সিং বেয়ারার পদে নিয়োগপত্র দেয়। ওই চিঠিতে তাকে ২৯ জুন থেকে কাজে যোগ দিতে বলা হয়।
অন্যদিকে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ২৪ জুন ঝিনাইদহের হামদহ এলাকা থেকে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ শেখ মাজেদুর রহমানকে আটক করা হয় এবং ২৫ জুন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
অভিযোগে বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, কারাগারে থাকা অবস্থাতেই তার নামে নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয়েছে বলে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় নিয়োগের আগে প্রার্থীর পরিচয়, যোগ্যতা, আইনগত অবস্থা ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নিয়োগসংক্রান্ত আরেকটি নথিতে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয় থেকে গ্ল্যান্স সিকিউরিটি সার্ভিসেসকে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ মাজেদুর রহমানকে ২৮ জুন নিয়োগপত্র দেওয়া হলেও ২৯ জুন থেকে কাজে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি তখন পর্যন্ত যোগ দেননি।
এ অবস্থায় নিয়োগপত্র ইস্যুর সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রার্থীর আইনগত অবস্থান সম্পর্কে অবগত ছিল কি না—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে নিয়োগের সুপারিশ, অনুমোদন, আবেদনপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, পুলিশ ভেরিফিকেশন, যোগদানপত্রসহ সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
শুধু নিয়োগ নয়, হাসপাতালের প্রায় ১১ কোটি টাকার সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়াও অভিযোগের মুখে পড়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এমএসআর টেন্ডারে এমন কিছু যোগ্যতার শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল, যাতে অনেক সক্ষম প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে পারেনি।

অভিযোগকারীদের দাবি, শর্তগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যে প্রতিযোগিতার পরিধি সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থে পণ্য ও সেবা কেনাকাটায় মূল্য প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) প্রকাশ্য নথিতেও দেখা যায়, ২০২৪ সালে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডারিং) আহ্বান করেছিল।
অভিযোগের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশনা দিয়েছে বলে অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। একটি সরকারি চিঠিতে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে মতামতসহ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া আদালতে দায়ের করা একটি মামলার নথিতেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দরপত্রে অতিরিক্ত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ শর্ত আরোপের অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের টেন্ডার নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এক প্রতিবেদনে প্রায় ৬ কোটি টাকার টেন্ডার এবং অন্যটিতে প্রায় ৪ কোটি টাকার এমএসআর টেন্ডার ঘিরে আইনি নোটিশের তথ্য উঠে আসে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে নিয়ম মেনেই কার্যক্রম পরিচালনার দাবি করেছিলেন।
তবে অতীতের অভিযোগগুলোর সঙ্গে বর্তমান অভিযোগের সম্পর্ক বা সেগুলোর সত্যতা এখনো সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি।
এদিকে নিয়োগসংক্রান্ত নতুন অভিযোগের বিষয়ে ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. কামরুজ্জামান সোহেল বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।