ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩
amaderkhobor24.com

আপনার শিশুও কি মোবাইল ছাড়া থাকতে পারে না? জেনে নিন ভয়ংকর পরিণতি

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: জুন ১৯, ২০২৬, ০৯:৪৭ এএম

আপনার শিশুও কি মোবাইল ছাড়া থাকতে পারে না? জেনে নিন ভয়ংকর পরিণতি

প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে স্মার্টফোন যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশুদের জীবনেও এর ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। এখন অনেক শিশুকেই দেখা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোনে ভিডিও, গেম, কার্টুন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্টে ডুবে থাকতে। এমনকি অনেক শিশু মোবাইল ফোনে ভিডিও না দেখলে খেতেই চায় না। ফলে সন্তানকে সামলানোর সুবিধার জন্য অনেক অভিভাবকও অজান্তেই স্মার্টফোনকে শিশুর ‘ডিজিটাল বেবিসিটার’ হিসেবে ব্যবহার করছেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, শৈশবে অতিরিক্ত স্ক্রিন নির্ভরতা শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা, বিশেষ করে JAMA Pediatrics-এ প্রকাশিত গবেষণাগুলো বলছে, স্মার্টফোন আসক্তি শিশুদের জন্য শুধু একটি অভ্যাসগত সমস্যা নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

চোখ, মস্তিষ্ক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
শিশুরা যখন দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন তাদের চোখ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম পলক ফেলে। এর ফলে চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা এবং দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের মধ্যে অল্প বয়সেই চোখের বিভিন্ন জটিলতা বাড়ছে।

শুধু চোখ নয়, দীর্ঘক্ষণ এক ভঙ্গিতে বসে থাকার কারণে ঘাড়, কাঁধ ও মেরুদণ্ডে ব্যথা হতে পারে। একই সঙ্গে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ায় স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ে। বাইরে খেলাধুলা বা দৌড়ঝাঁপের পরিবর্তে স্ক্রিনকেন্দ্রিক জীবনযাপন শিশুর সামগ্রিক শারীরিক বিকাশকে ব্যাহত করে।

ভাষা ও মানসিক বিকাশে বাধা
শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা গড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে দেরিতে কথা বলা, মনোযোগের ঘাটতি, অতিরিক্ত খিটখিটে মেজাজ এবং আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট শিশুদের শেখার প্রধান মাধ্যম হলো মানুষ ও পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। কিন্তু স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় কাটালে সেই স্বাভাবিক শেখার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে শিশুর ভাষা বিকাশ, আবেগ প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল ফোন বা ট্যাবলেট ব্যবহারের ফলে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবেই যদি শিশু দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিডিও ও রিলসের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে বাস্তব জীবনের ধীরগতির শেখার প্রক্রিয়ার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। এর ফলে ধৈর্য, মনোযোগ এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে।

ঘুমের সমস্যা বাড়ায় স্মার্টফোন
শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঘুমানোর আগে বা রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের ফলে ঘুমের হরমোন ‘মেলাটোনিন’-এর উৎপাদন ব্যাহত হয়। স্মার্টফোনের নীল আলো মস্তিষ্ককে জাগ্রত অবস্থায় রাখে, ফলে শিশুর ঘুম আসতে দেরি হয় কিংবা ঘুমের মান খারাপ হয়।

নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি শিশুর শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, মেজাজ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও আচরণগত পরিবর্তন
স্মার্টফোনে আসক্ত শিশুরা ধীরে ধীরে বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ থেকে দূরে সরে যেতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের আগ্রহ কমে যায়।

এছাড়া বিভিন্ন ধরনের অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্ট দেখার ফলে শিশুর আচরণ, ভাষা ও মানসিকতায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। অনেক সময় তারা বয়সের তুলনায় অপ্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠে অথবা অনুকরণমূলক আচরণ প্রদর্শন করতে শুরু করে।

স্মৃতিশক্তি ও শিক্ষার ওপর প্রভাব
গবেষকদের মতে, খুব অল্প বয়স থেকেই অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের স্মৃতিশক্তি ও শেখার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা অনেক সময় পড়া মনে রাখতে পারে না, সহজ বিষয়ও বুঝতে অসুবিধা হয় কিংবা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।

দ্রুত বিনোদননির্ভর কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়ে গেলে বই পড়া, চিন্তা করা বা দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ করার অভ্যাসও কমে যেতে পারে।

অভিভাবকরা কী করতে পারেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার চেয়ে নিয়ন্ত্রিত ও সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করাই বেশি কার্যকর।

১। শিশুর জীবনের প্রথম দুই বছর স্ক্রিন থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা উচিত।

২। ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে সীমিত স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

৩। ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে বিনোদনের বদলে শিক্ষামূলক কনটেন্টের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা যেতে পারে।

৪। মোবাইলের বিকল্প হিসেবে বই পড়া, ছবি আঁকা, গল্প শোনা, খেলাধুলা এবং পারিবারিক সময় কাটানোর সুযোগ বাড়াতে হবে।

৫। শিশু কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, সেদিকে নজর রাখতে হবে এবং বয়স উপযোগী কনটেন্ট নির্বাচন করতে হবে।

৬। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অভিভাবকদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে। কারণ শিশুরা বড়দের আচরণ থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে।

সচেতনতার বিকল্প নেই
প্রযুক্তি আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ হলেও শিশুদের জন্য এর ব্যবহার হতে হবে বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত। স্মার্টফোন সাময়িকভাবে শিশুকে শান্ত রাখতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত নির্ভরতা তার শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়ার আগে অভিভাবকদের ভাবতে হবে—সন্তানের সাময়িক ব্যস্ততা নাকি সুস্থ ভবিষ্যৎ, কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

Link copied!