প্রকাশিত: মার্চ ২৯, ২০২৬, ১০:৪৭ এএম
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে অচল অবস্থা বিরাজ করায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তবে এমন পরিস্থিতিতেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রয়েছে। একের পর এক জ্বালানিবাহী জাহাজ ভিড়ছে বন্দরে। গত ২৫ দিনে ভিড়েছে ৩০টি। আগামী ৪ এপ্রিলের মধ্যে ভিড়বে আরও ছয়টি। যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে।
তবে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো অপরিশোধিত তেলের সংকটে পড়েছে দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। প্রতিষ্ঠানটির হাতে বর্তমানে অপরিশোধিত (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) তেলের মজুত আছে মাত্র ৪০ হাজার টন। যা দিয়ে চলবে আগামী ১০-১২ দিন। দিনে সাড়ে ৪ হাজার পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন এই কারখানায় বর্তমানে দিনে ৩ হাজার ৮০০ টন করে পরিশোধন হচ্ছে। পরিশোধিত এসব তেল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে যাচ্ছে ভোক্তার হাতে। সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল পেয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারি। এখনও সেগুলো প্রতিদিন তিন হাজার ৮০০ টন করে ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে বিপিসির কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত এক মাসে ৩০টি জাহাজ জ্বালানি তেল নিয়ে বন্দরে ভিড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর গত ৩ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত এসব জাহাজ এসেছে। এর মধ্যে ২৭টি ইতোমধ্যে জ্বালানি খালাস করে ফিরে গেছে। বর্তমানে দুটি থেকে খালাস কার্যক্রম চলছে। আগামী ৪ এপ্রিলের মধ্যে আরও ছয়টি জাহাজ বন্দরে ভিড়বে। এসব জাহাজের মধ্যে তিনটিতে এলএনজি, দুটিতে গ্যাস অয়েল এবং একটিতে এলপিজি আসছে।’
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা ও তাদের মধ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কৌশলগত এই নৌপথ অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশেও। যদিও গতকাল চলমান যুদ্ধের মধ্যেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশের জাহাজ চলাচলে অভয় দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ এবং বিশেষ অনুমোদিত দেশের জন্য এই জলপথ খোলা থাকবে। ইরানের এই বন্ধুতালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরাক ও পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। কারণ সংঘাত তীব্র হওয়ার আগেই বেশ কয়েকটি জ্বালানিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণাণি অতিক্রম করে এবং যুদ্ধ শুরুর পরও ধারাবাহিকভাবে জাহাজগুলো দেশে আসছে।
বন্দর সূত্রে জানিয়েছে, ৩ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত আসা জাহাজগুলোর মধ্যে ছয়টিতে এলএনজি এসেছে। এর মধ্যে পাঁচটি এসেছে কাতার থেকে এবং একটি এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। এলপিজি নিয়ে এসেছে আটটি। এর মধ্যে তিনটি এসেছে মালয়েশিয়া, দুটি ওমান, দুটি এসেছে ভারত থেকে এবং একটি এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে। বাকি ১৬টি জাহাজের মধ্যে পাঁচটিতে গ্যাস অয়েল আনা হয়েছে। যার মধ্যে দুটি সিঙ্গাপুর, দুটি মালয়েশিয়া এবং একটি ভারত থেকে এসেছে। আরও চারটি জাহাজে হাই সালফার ফুয়েল এসেছে, যার সবগুলোই সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করা হয়েছে।
তবে পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ক্রুড অয়েল আমদানি নিয়ে। দেশে প্রতি মাসে গড়ে ১ থেকে দেড় লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়, যা দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মার্চ মাসে নির্ধারিত দুটি জাহাজের একটিও এখনও বন্দরে পৌঁছায়নি। সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি জাহাজে করে ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়েছিল। এরপর আর কোনও চালান দেশে আসেনি।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিং) মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমরা রিসিভ করেছি। সেগুলো পরিশোধন করা হচ্ছে। প্রতিদিন তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার মেট্রিক টন তেল পরিশোধন করা হচ্ছে এই কারখানায়। বর্তমানে কারাখানায় অপরিশোধিত তেলের সংকট আছে।’
আমদানির এক লাখ টন তেল ভর্তি জাহাজ অপেক্ষা করছে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২ মার্চ সকালে জাহাজটি দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে সেটি আটকা পড়েছে। পরিস্থিতি ভালো হলে সেটি দেশের উদ্দেশে রওনা দেবে। এ ছাড়া আরব আমিরাত থেকে আরও এক লাখ অপরিশোধিত তেল নিয়ে ২১ মার্চ দেশের উদ্দেশে আরও একটি জাহাজ রওনা দেওয়ার কথা ছিল। সেটির শিডিউল বাতিল করা হয়। নতুন করে আরও একটি জাহাজে আগামী ২১ এপ্রিল তেল লোড করার শিডিউল আছে। সেটি নির্দিষ্ট সময়ে তেল লোড করলে আগামী ১ অথবা ২ মে দেশে পৌঁছাবে। সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে জাহাজ পৌঁছাতে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ দিন লাগে। তবে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি নয়; বিকল্প নৌপথে দেশে আসার কথা আছে।’
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন। এর মধ্যে ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আর বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মালেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।