হাসপাতাল ভবন নির্মাণে ৩২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে সরকার। এনআইসিইউসহ মোট শয্যা রয়েছে ১০৫০টি।
বিপুল ব্যয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হলেও বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে। হাসপাতাল ভবন আছে, কিন্তু কার্যক্রম চালু হয়নি—এমন চিত্র দেখা গেছে রংপুর, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও কুমিল্লায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা কথা বলে জানতে পেরেছেন, এই ছয়টি হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ করলেও জনবল, আসবাব, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অর্থ বরাদ্দ না থাকায় রংপুর ছাড়া বাকি পাঁচটি হাসপাতাল স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো প্রতিষ্ঠান ভবন বুঝে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অব্যবহৃত অবকাঠামো পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, একাধিক ভবনে চুরির ঘটনাও ঘটছে।
হাসপাতাল ভবন আছে, কিন্তু কার্যক্রম চালু হয়নি—এমন চিত্র দেখা গেছে রংপুর, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও কুমিল্লায়।
হাসপাতালগুলো হচ্ছে রাজশাহী শিশু হাসপাতাল, খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল, রংপুর শিশু হাসপাতাল, বরিশাল শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লা শিশু হাসপাতাল ও সিলেট জেলা হাসপাতাল। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিলেট জেলা হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন এ হাসপাতাল শিশু হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিষয়ে স্থানীয় মন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে জেলা হাসপাতালের ঠিক পাশেই অবস্থিত সদর হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালটি নতুন জেলা হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। অন্যদিকে জেলা হাসপাতালের কার্যক্রম বর্তমানের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে নিয়ে সেটিকে শিশু হাসপাতালে রূপান্তর করারও মৌখিক প্রস্তাব ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়নি।
এই ছয়টি হাসপাতাল ভবন নির্মাণে সরকার এখন পর্যন্ত ৩২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রসহ (এনআইসিইউ) মোট শয্যা রয়েছে ১ হাজার ৫০টি। কোনো হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ৬ বছর আগে, কোনোটি ১০ মাস আগে।
বিগত সরকারের (আওয়ামী লীগ) সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই এসব হাসপাতালের ভবন তৈরি করা হয়। হাসপাতাল কীভাবে চলবে, তা চিন্তা করা হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান
সম্প্রতি হামের মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবে বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বাড়ছে। সেখানে সীমিত শয্যা ও জনবল নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসাসেবা। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের অবকাঠামো পড়ে থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা ও পরিকল্পনার ঘাটতির কারণেই এ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিগত সরকারের (আওয়ামী লীগ) সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই এসব হাসপাতালের ভবন তৈরি করা হয়। হাসপাতাল কীভাবে চলবে, তা চিন্তা করা হয়নি। হাসপাতাল চালু করতে প্রশাসনিক অনুমোদন লাগবে। জনবলের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। সর্বোপরি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেতে হবে। হাসপাতালগুলো চালু করার জন্য ইতিমধ্যে আমরা বেশ কয়েকটি মিটিং করেছি। দ্রুততম সময়ে সব প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা করছি।’
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের রংপুর কার্যালয়ের তথ্য বলছে, সিটি করপোরেশনের সামনে সদর হাসপাতালের ১ একর ৭৮ শতাংশ জমিতে তিনতলা হাসপাতাল ভবন ও আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা।
রংপুরে ৬ বছর ধরে পড়ে আছে ভবন
রংপুরের ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ছয় বছর আগে। এরপর এটি চালু করতে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের চিঠি-চালাচালি হয়েছে বেশ কয়েকবার। হাসপাতাল চালু করতে কমিটি করা হয়েছে কয়েকবার; কিন্তু সেই হাসপাতাল এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের রংপুর কার্যালয়ের তথ্য বলছে, সিটি করপোরেশনের সামনে সদর হাসপাতালের ১ একর ৭৮ শতাংশ জমিতে তিনতলা হাসপাতাল ভবন ও আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ৮ মার্চ সিভিল সার্জনকে হাসপাতাল ভবন বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ওই সময় করোনা রোগীদের জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। এরপর ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক অনুমোদন, জনবলের পদ সৃষ্টিসহ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ছাড়াই তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর ও সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৫ জুন ৬৫৯ জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এরপর একাধিকবার সুপারিশসহ প্রতিবেদন পাঠানো হলেও হাসপাতাল চালু হয়নি। এর মধ্যে গত বছরের ৫ অক্টোবর ১০০ শয্যার সেবা কার্যক্রম চালুকরণে অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। তবে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।
জনগণের টাকায় নির্মিত এত সুন্দর হাসপাতালটি কেন, কার অযোগ্যতায় চালু হলো না, এটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নাকি দায়িত্বহীনতা, তা খতিয়ে দেখা উচিত।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম
জেলা সিভিল সার্জন শাহীন সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতাল চালু না হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ জেলা উন্নয়ন কমিটির সভায় কয়েকবার তুলেছেন তিনি। আর এটি চালু করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করার কথা জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান।
ছয় বছরেও শিশু হাসপাতালটি কেন চালু হলো না, তা খতিয়ে দেখা উচিত বলে মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জনগণের টাকায় নির্মিত এত সুন্দর হাসপাতালটি কেন, কার অযোগ্যতায় চালু হলো না, এটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নাকি দায়িত্বহীনতা, তা খতিয়ে দেখা উচিত।
খুলনায় ভবন বুঝে নেয়নি স্বাস্থ্য বিভাগ
খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতালের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এক দশকের বেশি আগে। নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে দেড় বছর আগে। তবে ২০০ শয্যার এই হাসপাতালে এখনো সেবাদান চালু করতে পারেনি স্বাস্থ্য বিভাগ। গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভবন হস্তান্তরের জন্য একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তা বুঝে নেয়নি। সিভিল সার্জন কার্যালয় বলছে, হাসপাতালটির বিষয়ে তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছে। তবে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর ও গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের শুরুতে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। কাজ শেষের মেয়াদ ধরা হয় ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। ২০১৯ সালে কেডিএর ময়ূরী আবাসিক এলাকার ঠিক বিপরীতে সিটি বাইপাস সড়কের পাশে বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষ্ণনগর ও ডুমুরিয়া উপজেলার চক মথুরাবাদ মৌজায় ৫২ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় পাঁচ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। দুই ধাপে ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ভবন, রান্নাঘর, সাবস্টেশন, পাম্প হাউস, সীমানাপ্রাচীর, রাস্তা, নালা ও গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। কাজের মেয়াদ শেষ হয় ২০২৩ সালের জুনে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো চত্বর সুনসান। আগাছা জন্মেছে। বেশির ভাগ কক্ষ তালাবদ্ধ। ভেতরে ফ্যানসহ কিছু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থাকলেও কোনো শয্যা নেই। ভবনের সামনে আংশিক সীমানাপ্রাচীর আছে। তবে মূল ফটক নেই। বাকি তিন পাশে প্রাচীরও নির্মিত হয়নি। সিঁড়ির নিচের দিকের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা গেছে।
খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কাজ বুঝিয়ে দিতে প্রস্তুত। এর আগে হাসপাতালটি হস্তান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছি। তবে তারা বুঝে নেয়নি।’
খুলনার সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতাল ভবনের প্রাচীর নেই, ফটক নেই, লোকবল নেই। উন্মুক্ত ও অরক্ষিত অবস্থায় এটি পড়ে আছে। এটা বুঝে নিয়ে কে দেখভাল করবে? আমাদের পক্ষে সামাল দেওয়াটা কঠিন হবে।’
রাজশাহীতে চুরি যাচ্ছে জিনিসপত্র
‘কনস্ট্রাকশন অব গভর্নমেন্ট শিশু হসপিটাল অ্যাট রাজশাহী সিটি করপোরেশন’ শিরোনামের প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কেএসবিএল অ্যান্ড এইচই (জেভি) নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শিশু হাসপাতালটি নির্মাণ করেছে। রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। মূল কাজ তিন বছরেই শেষ হয়ে যায়। এরপর আরও কিছু কাজ দেওয়া হয়েছিল। সেগুলোও ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ করে প্রতিষ্ঠানটি। একই বছরের ৩০ অক্টোবর রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর ভবনটি হস্তান্তরের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। এরপর বারবার চিঠি দিলেও কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি বুঝে নিচ্ছে না।
সম্প্রতি নগরের টিবিপুকুর এলাকায় নির্মিত ওই হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে ঠিকাদারের একজন কর্মচারী পাহারায় আছেন। তিনি বলেন, বাইরের সব ফিটিংস রাতে চুরি হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। পাওয়ার কেব্লও নেই। পাহারাদার বলেন, এগুলোতে বাল্ব লাগানো ছিল। সব চুরি হয়ে গেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চারতলাবিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) শয্যা রয়েছে ৫২টি। এ ছাড়া ৯৬টি সাধারণ শয্যাসহ মোট ২০০ শয্যা রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ফরহাদ সরকার বলেন, হাসপাতাল ভবন তাঁদের পক্ষে আর পাহারা দিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁরা কিছু বলতে গেলেই গ্লাস ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। ফ্রেম খুলে নিয়ে যাচ্ছে।
হাসপাতাল বুঝে না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. কাউসার সরকার বলেন, সমস্যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। হাসপাতালের পক্ষে কে বুঝে নেবে, এটা ঠিকই হয়নি।
বর্তমান সিভিল সার্জন এস আই এম রাজিউল করিম কয়েক দিন আগে প্রথম আলোকে বলেন, এ ব্যাপারে তাঁদের কিছু বলার নেই। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পরিচালক পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম বলেন, এটা পরিচালকের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয়েছিল মাত্র।
সিলেটে হাসপাতাল পরিচালনা করবে কে—ঠিক হয়নি
সিলেট নগরে হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার দুই বছর হতে চলেছে। তবে কোন দপ্তর নতুন হাসপাতালটি পরিচালনা করবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। এ নিয়ে জটিলতায় ২৫০ শয্যার আটতলা ভবনটি পড়ে রয়েছে।
বিষয়টিকে ‘খেয়ালখুশির প্রকল্প’ বলে অভিহিত করে সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৯ জুলাই নগরের চৌহাট্টা এলাকায় ৬ দশমিক ৯৮ একর জায়গার ওপর ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ১৫ তলা ভিত্তিবিশিষ্ট হাসপাতালের অষ্টম তলা পর্যন্ত নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ৮৭ কোটি টাকা। ২০২০ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালের জুন মাসে শেষ হয়। শেষ পর্যন্ত ভবন নির্মাণে প্রায় ১০১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু জাফর বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিষ্ঠান এটি বুঝে নিতে রাজি হয়নি। অবশ্য কয়েক মাস আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হাসপাতালটি চালু করতে উদ্যোগী হন। তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপত্তাবেষ্টনী, ড্রেন নির্মাণসহ আরও কিছু কাজ করবে গণপূর্ত। এ জন্য ১০ কোটি থেকে ১১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরেকটি শাখা আসবাবও সরবরাহ করবে। এরপরই ভবন বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
গত রোববার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, বাইরে থেকে চকচকে দৃষ্টিনন্দন ভবনটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। নেই কোনো স্থায়ী নিরাপত্তাবেষ্টনী। টিন দিয়ে অস্থায়ী বেষ্টনী তৈরি করে ভবনের চারপাশ ঘিরে রাখা হয়েছে। কিছু জায়গায় জানালার গ্লাস ভাঙা। অযত্ন-অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি ক্রমেই জৌলুশ হারাচ্ছে।
বছরখানেক আগে স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সিলেটের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূরে আলম শামীমকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কোন দপ্তর নতুন হাসপাতালটি পরিচালনা করবে, এ দায়িত্ব কাউকেই দেওয়া হয়নি। ফলে হাসপাতাল চালু করা নিয়ে একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু নতুন সরকার এসেছে, নিশ্চয়ই এটি চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উদ্যোগী হবেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যে নির্দেশনা দেবেন, সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।’
কুমিল্লায় সেবাদান চালু না হওয়ায় ক্ষোভ
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের শয্যা ৪০টি। বিপরীতে প্রতিদিনই চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে। রোগীর চাপ সামাল দিতে নির্মাণ করা হয় ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতাল; কিন্তু ১০ মাস আগে নির্মাণ শেষ হলেও এখনো চালু হয়নি। এমনকি কোনো দপ্তর ভবনটি বুঝেও নেয়নি।
কুমিল্লা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। সময় বাড়ানোর পর ২০২৪ সালের জুনে কাজ শেষ করে মেসার্স এম এন হুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। কুমিল্লার সিভিল সার্জন আলী নুর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালের জন্য এখনো জনবল ঠিক হয়নি। আসবাব ও যন্ত্রপাতি কিছুই আসেনি। এ অবস্থায় এটি বুঝে নিলেও ফেলে রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছি।’
আসবাব ও সরঞ্জামের বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের প্রথম আলোকে বলেন, নির্মাণকাজের সঙ্গে আসবাব বা সরঞ্জাম ধরা নেই। সেগুলোর জন্য আলাদা দরপত্র হবে পরবর্তী সময়ে।
মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এই হাসপাতাল চালু হলে শুধু কুমিল্লা নয়, আশপাশের জেলাগুলোর মানুষও উপকৃত হবেন বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে অনেক আগেই হাসপাতালটির কার্যক্রম শুরু হতে পারত; কিন্তু এখনো হাসপাতালটি হস্তান্তর না হওয়া দুঃখজনক। বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে। এমন অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালটি চালু করা দরকার।
বরিশালে কয়েক দফায় সময় বাড়ানো হয়েছিল
বরিশাল নগরের আমানতগঞ্জ এলাকায় বিশেষায়িত ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল নির্মাণকাজে প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৯ কোটি ৪৮ লাখ ৩৩ হাজার ৫১ টাকা। ১০ তলা ভিত্তির ওপর প্রাথমিকভাবে চারতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। কার্যাদেশ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এ হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম চালু হওয়ার কথা থাকলেও কাজ শেষ না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় ছয় বছর পরেও চালু করা যায়নি।
গণপূর্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের দিকে হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর কাজ প্রায় শেষ হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। হাসপাতালটি চালু না হওয়াকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিকের বরিশাল নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটি চালু হলে হামের মতো এই জরুরি পরিস্থিতিতে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা যেত শিশুদের।
কয়েকটি হাসপাতাল তৈরি করার পর সেগুলো হস্তান্তরজনিত যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এই চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ প্রকট হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় স্তরে শুধু অনাগ্রহ নয়, চরম উদাসীনতা এবং অদক্ষতারও নমুনা এসব।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান
স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, এই হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণ হলেও হাসপাতাল পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক, বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য চিকিৎসক, টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য প্রায় ৩০০ জন জনবল লাগবে। লাগবে চিকিৎসা সরঞ্জাম। কিন্তু এখনো এসব জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের বিষয়টি সুরাহা হয়নি। এ দুই প্রক্রিয়াই বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে ভবন হস্তান্তর হলেও এই হাসপাতাল চালুর বিষয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
সম্প্রতি হাসপাতালটি ঘুরে দেখেছেন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এটির অবস্থান শের-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তিন কিলোমিটার দূরে, শহরের আরেক প্রান্তে। সে জন্য এত দূরত্বে চিকিৎসা সমন্বয় করাটা দুরূহ। তবে এখানে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে। হাসপাতালটি চালুর ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পৃথক চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালটির ভবন বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব বরিশাল জেলার সিভিল সার্জন এস এম মঞ্জুর-ই-এলাহী প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০ শয্যার হাসপাতাল হওয়ায় চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তার কাছে এটি হস্তান্তর করতে হবে। এ জন্য হাসপাতাল ভবন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে আমরা চিঠি দিয়েছি। তবে এখনো লিফট ও সাবস্টেশনের কাজ চলমান থাকায় হস্তান্তর হয়নি। হস্তান্তরের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সেভাবে আমরা এটি চালু করার উদ্যোগ নেব।’
এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে, সরকারের মধ্যে একধরনের অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায়। যখন কোনো কিছু নির্মাণ করতে হবে বা অবকাঠামো তৈরি করতে হবে, তখন তাদের আগ্রহের কমতি নেই। বাজেটে বরাদ্দের কমতি নেই। দিন দিন বাজেটের আকার বাড়ছে। এসব বরাদ্দ ঠিকই হচ্ছে, কিন্তু যখন জনসেবার প্রশ্নটি আসছে, তখনই অনাগ্রহের ব্যাপার প্রকট হয়ে ওঠে। স্ব-আরোপিত কিছু নিয়মকানুনের দোহাই দেওয়া হয়। কয়েকটি হাসপাতাল তৈরি করার পর সেগুলো হস্তান্তরজনিত যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এই চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ প্রকট হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় স্তরে শুধু অনাগ্রহ নয়, চরম উদাসীনতা এবং অদক্ষতারও নমুনা এসব।’