ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩
amaderkhobor24.com

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে নজিরবিহীন অচলাবস্থা

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ০৯:৩৫ এএম

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে নজিরবিহীন অচলাবস্থা

জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া মানবাধিকার অধ্যাদেশ পাশ না হওয়ায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নবনিযুক্ত সদস্যরা অফিসে যাচ্ছেন না। এতে করে কমিশনের কার্যক্রমে নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অভিযোগের নিয়মিত তদন্ত ও অনুসন্ধান কার্যক্রম থমকে গেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রশাসনিক কাজেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। 

প্রসঙ্গত, গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের আনা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ রহিত করে ২০০৯ সালের আওয়ামী লীগ আমলের আইন পুনঃপ্রচলন করে উত্থাপিত বিল পাশ করা হয়। যদিও ওইদিন বিরোধী দলের এমপিরা এতে চরম আপত্তি তোলেন। 

এভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের এই অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় ওইদিন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা মানবাধিকার কমিশনও কার্যকারিতা হারায়। এ কারণে অধ্যাদেশের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত কমিশন সদস্যদের দায়িত্ব পালনের কোনো সুযোগ থাকছে না। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, অধ্যাদেশ বাতিলের পর কমিশনের সদস্যরা অফিস থেকে অনানুষ্ঠানিক বিদায় নেন। এ সময় তারা দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত জটিলতার কথা উলে­খ করেন। পরে সোমবার তারা একটি খোলা চিঠি লিখে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেন। এতে এই অধ্যাদেশ বাতিলে বর্তমান সরকারের বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী সোমবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে অধ্যাদেশ বাতিলের পর কমিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। সঙ্গতকারণেই আমরা আর কমিশন কার্যালয়ে যাচ্ছি না। এখানে আমাদের পদত্যাগের কোনো প্রশ্ন নেই।’ 

জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণীত হয়। এতে কমিশনকে সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়। 

পরে জারিকৃত অধ্যাদেশের অধীনে মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করা হয়। এতে সদ্য বিলুপ্ত গুম কমিশনের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন সদস্যকে নবগঠিত কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়।  

যা আছে খোলা চিঠিতে: খোলা চিঠির শুরুতে লেখা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাশ না হওয়ায়, ভুক্তভোগীরা আমাদের বারবার প্রশ্ন করছেন ‘এখন আমাদের কী হবে?’ তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই খোলাচিঠি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সংসদে বলা হয় যে- গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর কারাদণ্ড, অথচ গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ পাশ করে জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হলেও প্রকৃত অর্থে ভবিষ্যতে জুলাই যোদ্ধারা মামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

কমিশনের সদস্যদের দাবি-সংসদীয় বিশেষ কমিটির যে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংসদে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে, তাতে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হবে। এটি আবার আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে আসবে। 

চিঠিতে বিদায়ি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর পাশাপাশি সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিসের স্বাক্ষর রয়েছে। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সদ্য সাবেক কমিশনার নাবিলা ইদ্রিস রোববার যুগান্তরকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের যে অধ্যাদেশের অধীনে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল সেটি আর নেই। ফলে মানবাধিকার কমিশনে তাদের থাকার আর সুযোগ ছিল না। এ কারণে তারা সেখান থেকে সরে এসেছেন। তবে তিনি মনে করেন, অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হলে ভালো হতো। খোলা চিঠিতে তারা এ বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখা দিয়েছেন। 

মানবাধিকার কমিশনের কর্মকর্তারা যুগান্তরকে বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগের পর দীর্ঘদিন কমিশনে অচলাবস্থা চলেছে। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মইনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ৫ সদস্যের কমিশন দায়িত্বভার গ্রহণ করে। এতে অনুসন্ধান এবং তদন্তসহ দাপ্তরিক কাজে পূর্ণাঙ্গ গতি ফিরে আসে। 

কিন্তু ৯ এপ্রিল কমিশন সদস্যরা এক জরুরি সভা ডেকে অফিস থেকে অনানুষ্ঠানিক বিদায় নেন। পরদিন থেকে তারা আর অফিসে আসবেন না বলে জানিয়ে দেন।   

জানা যায়, বর্তমানে দেড় হাজারের বেশি অভিযোগ পেন্ডিং অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু কমিশনারদের অনুপস্থিতিতে এসবের নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এছাড়া শুনানিসহ দাপ্তরিক কার্যক্রমেও জটিলতা দেখা দিয়েছে। নীতিনির্ধারণী অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে না।

Link copied!