ঢাকা বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩
amaderkhobor24.com

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে, ঢাকায় বাড়ছে সংকট

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: এপ্রিল ২২, ২০২৬, ০৯:১০ এএম

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে, ঢাকায় বাড়ছে সংকট

বিশ্ব ধরিত্রী দিবস উপলক্ষে বিশ্বের নানা দেশে পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকারের কথা উঠে এলেও ঢাকার বড় অংশ এখনো তীব্র পানিসংকট ও পানির মানের অবনতির সঙ্গে লড়াই করছে—যা নীতিগত অঙ্গীকার ও বাস্তবতার ব্যবধানকে স্পষ্ট করে তুলছে।

উচ্চ আদালতের একটি যুগান্তকারী রায়ে নিরাপদ পানযোগ্য পানিকে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে এটিকে জীবনের অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেওয়া ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি চলতি বছরের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। রায়ে পানি উৎস রক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ এবং ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে বাস্তবে রাজধানীর পরিস্থিতি তেমন উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ করছেন বাসিন্দারা।মিরপুরসহ দক্ষিণ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, কল্যাণপুর, পূর্ব মনিপুর ও পীরেরবাগ এলাকায় দীর্ঘ সময় পানির সরবরাহ বন্ধ থাকছে, কোথাও দিনে অল্প সময়ের জন্য পানি এলেও তা অনিয়মিত।

মাটিকাটা বাজারের বাসিন্দা খালিদুর রহমান বলেন, “নিয়মিত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। যখন আসে তখনও নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত।”পূর্ব মনিপুরের শিক্ষার্থী তাহমিনা আক্তার জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে বাধ্য হয়ে বোতলজাত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।শেওড়াপাড়া, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায়ও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় রাতের বেলায় পানি সরবরাহ দেওয়া হলেও তা অনিয়মিত।

ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, পাম্পিং স্টেশনের মেরামত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এসব সমস্যা হচ্ছে। তবে সংস্থাটি সামগ্রিক ঘাটতি না থাকলেও “লোকালাইজড ক্রাইসিস” বা নির্দিষ্ট এলাকার সংকটের কথা স্বীকার করেছে।

ঢাকার দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ২৯০ থেকে ৩০৫ কোটি লিটার, যেখানে প্রয়োজন প্রায় ৩১০ কোটি লিটার। প্রায় আড়াই কোটি মানুষ এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যার প্রায় ৭০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি থেকে সরবরাহ করা হয়।

ওয়ারপো’র পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার কাইয়ুম সাঈদুর রহমান বলেন, কিছু এলাকায় প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ থেকে ১২ ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ, উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়া এবং কংক্রিট কাঠামোর বিস্তারের কারণে প্রাকৃতিকভাবে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।তাদের মতে, ঢাকাকে টেকসই পানি ব্যবস্থার দিকে নিতে হলে ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহার বৃদ্ধি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মৌসুমি পানিসংকট ভবিষ্যতে স্থায়ী নগর সংকটে রূপ নিতে পারে।উচ্চ আদালতের রায় ও জাতিসংঘের ২০১০ সালের পানিকে মানবাধিকারের স্বীকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকলেও বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ব ধরিত্রী দিবসে পরিবেশ সুরক্ষার প্রেক্ষাপটে ঢাকার এই পরিস্থিতি দ্রুত নগরায়ণকেন্দ্রিক শহরগুলোর পানিসুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করা শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং পরিবেশগত শাসন ও নগর টেকসইতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

Link copied!