ঢাকা বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩
amaderkhobor24.com

৩ মাসে সারা দেশে ৮৫৪ ও ঢাকায় ১০৭ হত্যাকাণ্ড

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: এপ্রিল ২২, ২০২৬, ০১:২৮ পিএম

৩ মাসে সারা দেশে ৮৫৪ ও ঢাকায় ১০৭ হত্যাকাণ্ড

রাজধানী ঢাকায় বাড়ছে খুন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনেই অন্তত ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে ঢাকায় মোট ১০৭টি খুনের ঘটনা ঘটে। মাসভিত্তিক হিসাবে মার্চে ৩৩টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি এবং জানুয়ারিতে ৩৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটে।

 পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, একই সময়ে সারা দেশে মোট ৮৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে।

 এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রাঙামাটির কুতুকছড়ি আবাসিক এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে ধর্মসিং চাকমা নিহত হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় ভাগ্যশোভা চাকমা ও কৃপাসোনা চাকমা নামের দুই নারী গুরুতর আহত হন।

বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি, মিডিয়া) এএইচ এম শাহাদাৎ হোসাইন  বলেন, ‘যারাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত-তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। এজন্য পুলিশের নানামুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’ তিনি জানান, ‘জামিনপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীদের বিষয়েও আমাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে তাদের কোনো ভূমিকা আছে কিনা-সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ 

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করেও দেশীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছে। মোবাইল ফোনে সরাসরি ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সহযোগীরা উপস্থিত হয়ে ফোন ধরিয়ে দিয়ে ‘বড় ভাই’ কথা বলবেন জানিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।ফলে ভুক্তভোগীদের অনেকেই আতঙ্কে কোথাও অভিযোগ জানাতে সাহস পাচ্ছেন না।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাজার, ফুটপাত এবং পরিবহন খাত থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, জমি দখলসহ নানা অপরাধে সক্রিয় এসব চক্র।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চাঁদার অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সেখানে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এ অর্থে বিলাসী জীবনযাপন করছে।

এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জামিন পাওয়া অনেক সন্ত্রাসী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ আবার দেশে ফিরে এসেছে, কেউ ফিরতে চেষ্টা করছে। এমনকি কারাগারে থেকেও কেউ কেউ নির্দেশনা দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।জামিনপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্তত ছয়জন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী রয়েছে। এদের মধ্যে কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম (ইমন), খন্দকার নাঈম আহমেদ (টিটন) এবং খোরশেদ আলম (ফ্রিডম রাসু) উল্লেখযোগ্য। তাদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নাম উঠে এসেছে পিচ্চি হেলালের। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, এলিফ্যান্ট রোডসহ আশপাশের এলাকার অপরাধজগতে পিচ্চি হেলালের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইমন। 

এলিফ্যান্ট রোডের বিপনিবিতান মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় ইমনের লোকজন জড়িত বলে জানা গেছে। জামিন পওয়ার পর ইমন থাইল্যান্ড চলে গেলেও তার অপতৎপরতা থেমে নেই। 

মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক ও কাফরুল এলাকায় কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তৎপরতা রয়েছে বলে জানা গেছে। তারা হলেন মফিজুর রহমান মামুন, শাহাদাত হোসেন ওরফে সাধু, কিলার আব্বাস ও ইব্রাহিম খলিল ওরফে কিলার ইব্রাহিম। এরা সবাই দেশের বাইরে অবস্থান করছে এবং মাঝেমধ্যে বিদেশ থেকে মুঠোফোনে হুমকি দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। তাদের হয়ে কাজ করছেন স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। এদের মধ্যে মামুনের বিরুদ্ধে অন্তত ২৭টি মামলা রয়েছে। আব্বাস অন্তত এক ডজন মামলার আসামি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে কারাগারে ছিলেন কিলার আব্বাস। 

সম্প্রতি কাফরুলে একটি গার্মেন্ট কারখানায় ঢুকে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা। টাকা না দেওয়ায় তারা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা ‘ফোর স্টার’ নামের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় গত জানুয়ারিতে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারীদের গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির। ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী গত বছরের সেপ্টেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থকে মুক্তি পান। জামিন পাওয়ার ১২ দিনের মধ্যেই তিনি দুবাই হয়ে চলে যান সুইডেনে। সেখানে বসেই তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অপরাধ জগত। তার বিরুদ্ধে ২২টি মামলা ছিল। যার মধ্যে হত্যা মামলা ৯টি। বেশ কয়েকটি মামলায় সাজাও হয় তার। এর মধ্যে অস্ত্র মামলায় ১৭ বছরের জেলও হয়। 

তবে সর্বশেষ এই সন্ত্রাসীর নামে আর কোনো মামলা বিচারাধীন আছে কি-না তা পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে আতঙ্কের খবর হলো-সন্ত্রাসীদের গডফাদার হিসাবে পরিচিত ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির পেশার টার্গেটকৃত লোকজনকে এমন তথ্য দিয়ে হুমকিও দিচ্ছে তার অনুসারীরা। এতে রাজধানীর ফার্মগেট, ইন্দিরারোড, কাওরানবাজার, তেজগাঁও, শেরেবাংলানগর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাতিরঝিল ও শিল্পাঞ্চল এলাকায় জনমনে ভীতি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

যে এলাকায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন যারা : ফার্মগেট-কাওরানবাজার এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের যেসব সহযোগী মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বাদশাহ, আহাদ, সিদ্দিক, রবিন, মাসুদ, আরিফ প্রমুখ। এদের মধ্যে বাদশা ও আহাদের অবস্থান মিরপুরের শাহআলী এলাকায়। খামারবাড়ি এলাকায় সিদ্দিক, রবিন, মাসুদ, আরিফ, ইকবাল এবং রুবেল প্রমুখ। এরা ওয়াসা ভবন, তিতাস ভবন, কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ি), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি উন্নয়ন অধিদপ্তর (সেচভবন) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসের টেন্ডার দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। টেন্ডার বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে যে কোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, মোসাব্বির হত্যাকাণ্ডের পর কাওরান এলাকায় এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারী চাঁদাবাজদের দাপট কমে গিয়েছিল। সম্প্রতি ফের তাদের তৎপরতা বেড়েছে। তারা কাওরানবাজারের আড়ত, দোকান ও সবজির ট্রাক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা তুলছে। চাঁদা উঠাচ্ছে গ্রীন রোড ও ইন্দিরা রোডের অবৈধ লেগুনা স্ট্যান্ড থেকেও। মাদক কারবার, কন্ট্রাক্ট কিলিং এবং জমি দখলসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগীরা। কোথাও আবার রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চলছে সন্ত্রাসী কার্যক্রম। এছাড়া নানা প্রলোভনে ফেলে কিশোর ও তরুণদেরও তাদের দলে যুক্ত করে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বড় করা হচ্ছে।

ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের যেসব সদস্য আতঙ্ক তৈরি করছে তাদের মধ্যে আছে ইব্রাহিম, মুন্না, কিলার বাদল, কিলার জসিম, রাজেস খান, সোহেল আকন ওরফে তেল সোহেল, মোজাম্মেল, শরীফ, রুবেল, লেদু হাসান, মামুন, কালু ওরফে কিলার কাল্লু, সানি ওরফে তপন সানি, মিলন ওরফে ডাক্তার মিলন, সুমন ওরফে কাইল্যা সুমন, আফজাল ওরফে নেট আফজাল, সাইফুল ওরফে পিচ্চি সাইফুল, ভিল্লু পারভেজ, হারুন ওরফে ভাগিনা হারুন, নজরুল ওরফে হাড্ডি খোকন, আরমান, আসাদুল ওরফে লম্বু আসাদুল, শাহরুখ, আল আমিন, নবী, আব্দুল্লাহ প্রমুখ। এদের মধ্যে কিলার জসিম ১৮ বছর কারাভোগ করার পর সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছে। তিনি ছিলেন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে কাজ করছে লেদু হাসান।

 গত নভেম্বরে রাজধানীর পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দুইটি গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি উঠে এসেছে। নিহত তারিক সাইফ মামুন রাজধানীর তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। একসময় তিনি ইমনের সহযোগী ছিলেন। পরে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। এই হত্যাকাণ্ডে উঠে এসেছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের নামও। ১৯৯৭ সালে মোহাম্মদপুরে জোসেফের ভাই টিপু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান আসামি ছিলেন মামুন। সেই ক্ষোভ থেকে জোসেফের টার্গেটে ছিল মামুন।

 রাজধানীর অন্যান্য স্থানের তুলনায় হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা বেশি ঘটছে মোহাম্মদপুরে। গত ১৫ এপ্রিল গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় আসাদুল হক নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এর দুইদিন আগে ১২ এপ্রিল বিকালে মোহাম্মদপুরে রায়ের বাজার এলাকায় ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমন নামের এক সন্ত্রাসীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ রকম চিত্র শুধু মোহাম্মদপুরেই নয়, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ইশারায় নগর জুড়েই তৎপর কিলাররা। 

Link copied!