প্রতীকী ছবি।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একজন মুমিনের প্রতিদিনের জীবনের অন্যতম প্রধান ইবাদত। নামাজের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, তার আনুগত্য প্রকাশ করে এবং দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে কিছু সময়ের জন্য নিজেকে আল্লাহর স্মরণে নিবেদিত করে। তবে সালাম ফেরানোর সঙ্গে ইবাদতের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ফরজ নামাজের পর বিভিন্ন জিকির ও দোয়া করেছেন এবং দিনের বিভিন্ন সময়েও বিশেষ কিছু আমল পালন করেছেন।
নামাজ-পরবর্তী আমলগুলো সহজে মনে রাখা ও নিয়মিত পালনের জন্য এগুলোকে দুই ভাগে সাজানো যায়—প্রতিটি ফরজ নামাজের পরের অভিন্ন সুন্নাহ আমল এবং সময়ভেদে করা অতিরিক্ত বা ঐচ্ছিক আমল।
প্রতিটি ফরজ নামাজের পরের অভিন্ন আমল
পাঁচ ওয়াক্তের প্রতিটি ফরজ নামাজের পর কিছু জিকির ও দোয়া করা সুন্নাহ।
তিনবার ইস্তিগফার
রাসুলুল্লাহ (সা.) ফরজ নামাজ শেষ করে তিনবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলতেন। এরপর বলতেন—আল্লাহুম্মা আনতাস সালামু ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারাকতা ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম।-( সহিহ মুসলিম: ৫৯১)।
আয়াতুল কুরসি
ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। তাই নামাজের পর নিয়মিত আয়াতুল কুরসি পাঠ করা উত্তম আমল।-( সুনান আন-নাসাঈ, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল-লাইলাহ: ১০০)।
তাসবিহ, তাহমিদ ও তাকবির
ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করে শেষে বলা যায়—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহ, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।-( সহিহ মুসলিম: ৫৯৭)।
অন্য সহিহ বর্ণনায় ৩৩ বার তাসবিহ, ৩৩ বার তাহমিদ এবং ৩৪ বার তাকবির পাঠের কথাও এসেছে।-(সহিহ মুসলিম: ৫৯৬)।
দোয়া
ফরজ নামাজের পর নিজের, পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য দোয়া করা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।-(সুরা গাফির: ৬০)। এ সময় দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, হেদায়াত, ক্ষমা, সুস্থতা, হালাল রিজিক এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য দোয়া করা যেতে পারে।
ওয়াক্তভিত্তিক অতিরিক্ত আমল
ফরজ নামাজের পরের অভিন্ন জিকিরের পাশাপাশি দিনের বিভিন্ন সময়ে কিছু আমল করা যায়। এগুলোকে ফরজ-পরবর্তী আবশ্যিক তালিকা হিসেবে না দেখে অতিরিক্ত নেক আমল হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
ফজরের পর: কোরআন ও সকালবেলার জিকির
ফজরের পর দিনের শুরুটা কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ায় কাটানো সুন্দর অভ্যাস। আল্লাহ তাআলা বলেন—নিশ্চয়ই ফজরের কোরআন পাঠ প্রত্যক্ষ করা হয়।-(সুরা আল-ইসরা: ৭৮)।
সকাল ও সন্ধ্যায় আল্লাহর অধিক স্মরণের নির্দেশও কোরআনে এসেছে—তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা ঘোষণা করো।-( সুরা আল-আহযাব: ৪১–৪২)।তাই ফজরের পর সামর্থ্য অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াত এবং সকালবেলার মাসনুন জিকির করা যেতে পারে।
জোহরের পর: সংক্ষিপ্ত আমল ও দোয়া
জোহরের পর আলাদা দীর্ঘ আমলের তালিকা তৈরি করার প্রয়োজন নেই। ফরজ-পরবর্তী নির্ধারিত জিকিরগুলো আদায় করে প্রয়োজনীয় দোয়া করা যথেষ্ট। এ সময় হালাল রিজিক, কাজে বরকত, দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য এবং ভুল-ত্রুটি থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না।-(সুরা আত-তালাক: ২–৩)।
আসরের পর: সন্ধ্যার জিকির
আসরের পর সন্ধ্যার সময় ঘনিয়ে আসে। এ সময় সন্ধ্যার মাসনুন জিকিরগুলো পড়া যেতে পারে।বিশেষভাবে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস সকাল-সন্ধ্যায় পাঠের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।-( সুনান আবু দাউদ:৫০৮২)।এসব সূরায় আল্লাহর একত্ব, তার আশ্রয় এবং বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনার শিক্ষা রয়েছে।
মাগরিবের পর: পরিবারের দ্বীনি শিক্ষা
মাগরিবের পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অল্প সময় কোরআন, হাদিস, দোয়া ও ইসলামী আদব শেখার জন্য রাখা যেতে পারে। বিশেষ করে সন্তানদের নামাজের প্রতি আগ্রহী করা, ছোট ছোট দোয়া শেখানো, সত্যবাদিতা ও পিতা-মাতার সম্মানের শিক্ষা দেওয়া পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা বলেন—হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।-( সুরা আত-তাহরিম: ৬)। প্রতিদিন দীর্ঘ আলোচনা জরুরি নয়; কয়েক মিনিটের নিয়মিত দ্বীনি শিক্ষা থেকেও সুন্দর ইসলামী পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।
এশার পর: রাতের সুন্নাহ আমল
এশার পর দিনের সমাপ্তিতে তওবা, আত্মসমালোচনা এবং ঘুমের সুন্নাহ আমল করা যায়।
তাসবিহে ফাতেমি
ঘুমানোর আগে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পাঠের শিক্ষা রাসুলুল্লাহ (সা.) দিয়েছেন।-( সহিহ আল-বুখারি: ৩৭০৫; সহিহ মুসলিম: ২৭২৭)।
সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত
রাতে সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠের ফজিলত রয়েছে।-(সহিহ আল-বুখারি: ৫০০৯; সহিহ মুসলিম: ৮০৮)।
তিন কুল পাঠ
ঘুমানোর আগে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করে শরীরে হাত বুলানোর আমলও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ।-( সহিহ আল-বুখারি: ৫০১৭)।
আমলের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি
* ফরজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
নফল বা অতিরিক্ত আমলের আগে ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা জরুরি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো পড়া, পবিত্রতা বজায় রাখা এবং নামাজে খুশু-খুজু অর্জনের চেষ্টা করা অতিরিক্ত আমলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
* নিয়ত ও একনিষ্ঠতা
যেকোনো ইবাদতের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি। মানুষের প্রশংসা, সামাজিক মর্যাদা বা আত্মপ্রদর্শনের জন্য আমল করা উচিত নয়।
* গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা
শুধু জিকির ও নফল আমল করলেই হবে না; মিথ্যা, গিবত, প্রতারণা, অন্যায় উপার্জন ও মানুষের অধিকার নষ্ট করা থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। ইবাদতের প্রভাব মানুষের চরিত্র ও আচরণে প্রকাশ পাওয়া উচিত।
* মানুষের হক আদায়
পিতা-মাতা, পরিবার, আত্মীয়, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের অধিকার আদায় করা মুমিনের দায়িত্ব। আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণও দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
* আত্মসমালোচনা ও তওবা
প্রতিদিন নিজের কাজ পর্যালোচনা করা উচিত—কোথায় ভুল হয়েছে, কারও প্রতি অন্যায় হয়েছে কি না এবং কোন আমলে ঘাটতি রয়েছে। ভুল হলে দ্রুত তওবা করে সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।
* সহিহ দলিলের প্রতি গুরুত্ব
কোনো আমলের নির্দিষ্ট সংখ্যা, সময় বা বিশেষ ফজিলত উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সহিহ কোরআন-হাদিসের ওপর নির্ভর করা জরুরি। ইবাদতের ক্ষেত্রে দলিলনির্ভরতা মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরের আমলগুলো সুশৃঙ্খলভাবে পালন করলে দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও আল্লাহর স্মরণ অব্যাহত রাখা সহজ হয়। ফরজ নামাজের পর ইস্তিগফার, আয়াতুল কুরসি, তাসবিহ-তাহমিদ-তাকবির ও দোয়া এবং সময় অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াত, সকাল-সন্ধ্যার জিকির, পারিবারিক দ্বীনি শিক্ষা ও রাতের সুন্নাহ আমল—সব মিলিয়ে একজন মুমিনের দিনটি ইবাদতের ধারায় সাজানো সম্ভব।তবে আমলের সৌন্দর্য শুধু সংখ্যায় নয়; এর প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে নিয়ত, একনিষ্ঠতা ও ধারাবাহিকতায়। লোক দেখানো থেকে বেঁচে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে উদ্দেশ্য করা এবং জিকিরের প্রভাব চরিত্র, পরিবার ও মানুষের সঙ্গে আচরণে প্রকাশ করা জরুরি।রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।আল্লাহ তাআলা বলেন। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।—(সুরা আর-রাদ: ২৮)।তাই সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করে নিয়মিত আমল করা, ফরজ ইবাদতকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করাই হওয়া উচিত মুমিনের লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সহিহ জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার, ইখলাসের সঙ্গে তা অব্যাহত রাখার এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার।