আমার আগের লেখায় আমি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উপস্থিতিকে ‘দ্য এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম’ (ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা) হিসেবে অভিহিত করেছিলাম। দলটির উপস্থিতি ব্যাপক হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনের কেউ এটি নিয়ে কথা বলতে রাজি ছিলেন না।
১৩তম সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। এখন নির্বাচিত সরকারের পক্ষে সেই হাতিটিকে আর উপেক্ষা করা কঠিন, যার উপস্থিতি এখনও রাজনীতিতে বিস্তৃত।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার (আইজি) আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করায় এই সিদ্ধান্তটি আইনিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের এক নির্বাহী আদেশে দলটিকে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা হয়।
তবে সেই আদেশে এটি স্পষ্ট করা হয়নি যে, এই নিষেধাজ্ঞা কি কেবল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে, নাকি বাইরের রাজনৈতিক কর্মসূচি, এমনকি দলীয় কার্যালয় বা ব্যক্তিগত বাসস্থানে রাজনৈতিক বা সামাজিক আলাপচারিতার ওপরও কার্যকর কি না।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের বড় একটা সময়জুড়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূলের বিশাল কর্মী বাহিনী এবং তাদের সমমনা বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী সমাজের অনেককেই আটক রাখা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযোগ ছিল— জুলাই অভ্যুত্থানে বিক্ষোভকারীদের ‘হত্যা’ সংক্রান্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা।
বাস্তবতা হলো, আটককৃতদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই সরাসরি হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বা ঘটনাস্থলের আশেপাশে ছিলেন। ফলে গত এক বছরে পুলিশ তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই কোনও সুনির্দিষ্ট মামলা বা চার্জশিট তৈরি করতে পারেনি। অপরদিকে, বিচার বিভাগ স্বাধীন না হওয়ায় তাদের জামিন আবেদনও গ্রহণ করা হয়নি।
শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অল্প কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’-এর অভিযোগ আনা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, তারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এমন ‘নির্দেশ দেওয়ার’ অবস্থানে ছিলেন— যেখান থেকে তারা বিক্ষোভকারীদের হত্যায় প্ররোচনা বা সহায়তা দিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং হত্যাযজ্ঞে সরাসরি জড়িত থাকার দায়ে উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
যে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করার অভিযোগে মামলা চলছে, সেই মামলাগুলো এখনও চলমান রয়েছে। কিন্তু ‘যুদ্ধাপরাধ’এর অভিযোগে অভিযুক্ত অধিকাংশ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র এখনও প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে; মাত্র কয়েকজনকেই বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হয়েছে।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অদৃশ্য উপস্থিতি
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তৃণমূলের অসংখ্য নেতাকর্মী, যাদের বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় কোনও অভিযোগ ছিল না, তারাও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ ছিলেন। ফলে তারা মনোনয়ন জমা দিতে পারেননি বা ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে লড়াই করতে পারেননি। এমনকি যারা গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করেছিলেন, তাদেরকেও এবার মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে দলটির লাখ লাখ ভোটার তাদের পছন্দের দলকে ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা সমর্থকদের ভোট বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন। ভোটার উপস্থিতির হার দেখলে মনে হয়, প্রায় ২০ শতাংশ ভোটার সেই ডাকে সাড়া দিয়েছেন। ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮৭ শতাংশ, সেখানে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬০ শতাংশ।
ধারণা করা হয়, নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের অন্তত ১০-১৫ শতাংশ এসেছে আওয়ামী লীগের চিরাচরিত ভোটারদের কাছ থেকে। আওয়ামী লীগ না থাকায় তারা মূলত জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকানোর উদ্দেশ্যে বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিএনপির বড় জয় এর একটি বড় প্রমাণ। মজার ব্যাপার হলো— কিছু প্রভাবশালী বিএনপি নেতার দাবি, কিছু আসনে জামায়াতের জয় বা ভোট বৃদ্ধির পেছনে আওয়ামী ভোটারদের কৌশলগত সমর্থন ছিল, যারা বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করতে চেয়েছিল।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় যে, সুযোগ পেলে এখনও ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশ আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে প্রস্তুত। তবে গভীরতর নির্বাচনি বিশ্লেষণ ছাড়া এটি একটি আনুমানিক হিসাব মাত্র। ব্যালট বাক্সে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াত উভয়েই সংসদে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হলে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমতো, জামায়াতের আসন সংখ্যা হ্রাস পেতো এবং হয়তো একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো।
নেপথ্য থেকে প্রকাশ্যে আসার লড়াই
আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের আড়ালে থাকার পেছনে কেবল সরকারি নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং বিভিন্ন ‘চরমপন্থি’ গোষ্ঠী এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিএনপির একটি অংশের সহিংসতার ভয়ও কাজ করেছে। জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার কথা না বললেও, পর্দার আড়ালে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারে। নির্বাচনি সুবিধাভোগী হিসেবে জামায়াতের এই অবস্থান বোধগম্য। তবে জামায়াতে ইসলামী দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে কিছু প্রক্সি চরমপন্থি গোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে রাজপথ ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে সহিংসতার আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারে, এমনটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযানের নামে আওয়ামী লীগ কর্মীদের রাজপথে দেখলেই গ্রেফতারের নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। এত ঝুঁকি ও গ্রেফতারের মুখেও হাজার হাজার কর্মীকে দীর্ঘদিন রাজপথের বাইরে রাখা দলটির নেতৃত্বের ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে। শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা নিজ নিজ এলাকা ছেড়ে প্রধানত ভারত বা বিশ্বের অন্যান্য দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। কর্মীদের জন্য কোনও দিকনির্দেশনা নেই। এই দিশেহারা অবস্থায় কর্মীরা ঘরে লুকিয়ে থেকে বা অনেকে বিএনপি-জামায়াতের কাছে আশ্রয় নিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অল্প কয়েকজন সাহসী ব্যক্তি প্রকাশ্যে এসেছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কিছু জেলায় আওয়ামী লীগ অফিস খোলার চেষ্টা করলেও তা বিএনপির বাধার মুখে পড়েছে। রাজপথে উপস্থিত জানান দিতে লীগের চেষ্টাকালেও গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রকাশ্যে আসা আ. লীগ কর্মীদের গ্রেফতার করা পুলিশ অব্যাহত রেখেছে। বিএনপি এখনও ঠিক করতে পারছে না তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের কর্মীরা হয়তো বিএনপির আশ্রয় চেয়েছেন এবং হয়তো নির্বাচনে ভোটও দিয়েছেন। কিন্তু এখন বিএনপি ক্ষমতায় চলে আসায় আওয়ামী লীগের সমর্থন আর তাদের প্রয়োজন নেই। স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির যারা ১৭ বছর আওয়ামী লীগের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন, তারা এখন প্রতিশোধ নিতে চাইছেন।
তবে শীর্ষ পর্যায়ে এক ধরনের উপলব্ধি আছে যে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু সেটি কখন এবং কীভাবে, তা নিয়ে তারা এখনও নিশ্চিত নন। তারেক রহমান আওয়ামী লীগকে কীভাবে মোকাবিলা করবেন, তার ওপর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণও নির্ভর করছে।
সম্পর্কের সেতুবন্ধন
অনেক কিছুই নির্ভর করছে শেখ হাসিনার ওপর। তার কর্তৃত্ববাদী শাসনে দলের ভেতর একটি পিঁপড়াও তার অনুমতি ছাড়া নড়তে পারত না। তিনি কোনও উত্তরসূরী গড়ে তোলেননি বা স্থানীয় নেতাদের কোনও রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চার সুযোগ দেননি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন একটি রাজনৈতিক দল আজ যে স্থবিরতায় নিমজ্জিত, তার পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের দমনপীড়ন যেমন দায়ী, তেমনি নেতৃত্বের এই শূন্যতাও সমভাবে দায়ী।
শেখ হাসিনা এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আতিথেয়তার ওপর নির্ভরশীল। আওয়ামী লীগের ভাগ্য তার হাতে থাকলেও তিনি আর আগের মতো স্বাধীন নন। দীর্ঘ ১৭ বছরের বন্ধুপ্রতিম একটি দলের পতন হজম করা মোদি সরকারের জন্য কঠিন ছিল। ফলে অধ্যাপক ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল শীতল। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।
তারেক রহমান ও তার নবনির্বাচিত সরকারের প্রতি দিল্লির আচরণ এখন বেশ উষ্ণ। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে মোদির শোকবার্তা এবং পরবর্তীকালে তারেক রহমানকে সপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ সেই উষ্ণতারই বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের আশ্রয় নেওয়া দুই খুনিকে ফেরত দেওয়া এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ডিজেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি ভারতের ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়।
ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চায়, কিন্তু তাদের ‘গেস্ট রুমে’ থাকা হাতিটিকে (শেখ হাসিনা) তারা উপেক্ষা করতে পারছে না। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথা মনে রাখলেও ভারত হয়তো একপাক্ষিক সম্পর্কের ঝুঁকি বুঝতে পেরেছে। বিএনপির সঙ্গে টেকসই সম্পর্ক গড়তে হলে ভারতকে শেখ হাসিনার বিষয়ে তাদের অবস্থান নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। অপরদিকে, তারেক রহমানকেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের স্থান নিশ্চিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এটি ঘটার জন্য, অনেকগুলো বাধা অতিক্রম করতে হবে, যার শুরু হবে শেখ হাসিনার পরিণতি দিয়ে। এতে জুলাই/আগস্টের হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকার জন্য তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি সমাধান করতে হবে।
ইন্দো-বাংলাদেশ সম্পর্কের গতিপথের সঙ্গে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হবে আওয়ামী লীগের ওপর শেখ হাসিনার আধিপত্য ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সরে যাওয়া।
শেখ হাসিনা যখনই আওয়ামী লীগের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবেন, তখনই দলটির জন্য কোনও বাস্তবসম্মত নীতি উদ্ভূত হতে পারবে, যাতে নতুন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দলটি পুনর্গঠন এবং নতুন অবস্থান নিতে পারে।
উপসংহারে বলা যায় যে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রে ফেরার নতুন অঙ্গীকারের স্থিতিশীলতা ও টেকসইতা নির্ভর করবে তারেক রহমান কীভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া সমস্যার (এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম) বিষয়টি পরিণতভাবে মোকাবিলা করেন তার ওপর।
রেহমান সোবহান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিষ্ঠাতা।
আপনার মতামত লিখুন :