জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে ধারাবাহিক আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দলীয় ঐক্যজোট। সংসদে দাবি উত্থাপন, মুলতবি প্রস্তাব ও ওয়াকআউটের পর এবার রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে জোটটি। সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের কথাও জানিয়েছে তারা।
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জুলাই সনদ সংসদের আলোচ্যসূচিতে থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি নেই। সে কারণেই সংসদের পাশাপাশি রাজপথে চাপ সৃষ্টির কৌশল নেওয়া হয়েছে।
৬ এপ্রিল জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের রায় বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দল সংসদ থেকে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার ভাষায়, ৪ এপ্রিলের কর্মসূচির মধ্য দিয়েই রাজপথের আন্দোলন শুরু হয়েছে। পরে ৭ এপ্রিল গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সারা দেশে সাত দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে ১১ দল। কর্মসূচির মধ্যে গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ, সেমিনার ও বিক্ষোভ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে চারটি বাতিল এবং ১৬টি এখনই বিল আকারে না আনার সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। ফলে এই ২০টি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা থাকছে না। এতে আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল। গণভোটে বিপুল সমর্থন পাওয়ার পরও সরকার গণরায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে বলে তাদের অভিযোগ। তাদের দাবি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ কারণেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে ১১ দলীয় জোট। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের চার জন নেতার সঙ্গে কথা বলে বিরোধী দলের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের মধ্যেও আমরা রাজপথ থেকে পিছপা হইনি। এবারও সংসদের ভেতরে ও বাইরে গঠনমূলক বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছি। সংসদে সরকারের অসঙ্গতি তুলে ধরছি, পাশাপাশি রাজপথেও ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি চলছে। আগামী দিনে জোটগতভাবে সরকার-বিরোধী আন্দোলন আরও বেগবান করা হবে। শুধু ১১ দলীয় জোট নয়, অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তিও আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে বলে আশা করছি। তবে আমাদের সব কর্মসূচিই শান্তিপূর্ণ হবে।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, “পরিবেশ ও পরিস্থিতির আলোকে আমাদের আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হবে।”
অপরদিকে বিরোধী দলের গঠনমূলক আন্দোলনে বাধা দেওয়া হবে না জানিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বলেন, “ধ্বংসাত্মক কোনও কর্মসূচি হলে তা অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখবে।”
রাজনৈতিক এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচি বা আন্দোলন সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়, ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রামের অধিকার রয়েছে। তবে আন্দোলনে যাওয়ার আগে বিদ্যমান সব গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায় কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত। বর্তমান সরকারের স্বল্প সময়ের মধ্যেই আবার আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হলে অন্য কোনও শক্তি সেই সুযোগ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলবে।”
তিনি আরও বলেন, আন্দোলন প্রায়ই সংঘাত, সহিংসতা ও জনভোগান্তির কারণ হয়। তাই সংলাপ ও আলোচনার মধ্য দিয়েই সংকট সমাধানের চেষ্টা করা দরকার। আন্দোলন হলেও সেটি অবশ্যই গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় পরিচালিত হওয়া উচিত।
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “রাজনৈতিক আন্দোলন বিরোধীদল চালাতেই পারে। এটা তাদের অধিকার। সুষ্ঠুভাবে কর্মসূচি পালন করলে পুলিশ নিরাপত্তা দেবে। তবে আন্দোলনকে ঘিরে কোনও ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
সার্বিকভাবে, বিরোধী দলগুলো সরকারের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে জোটগত আন্দোলন আরও বেগবান করার ঘোষণা দিলেও সরকারি দল এখন পর্যন্ত বাধা না দেওয়ার নীতিতে অটল রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।