ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের প্রায় ৩৭ শতাংশ ডেটা ট্রাফিক এই অঞ্চলের সাবমেরিন কেবল দিয়ে যায়।
সূত্র বলছে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাঝখানে অবস্থিত এই সরু জলপথ দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি পরিবহনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রণালিটির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র প্রায় ৩৩ কিলোমিটার চওড়া। বড় জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট সংকীর্ণ লেন ব্যবহার করতে হয়। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর বড় অংশ যায় এশিয়ার বাজারে, যার মধ্যে ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম।
সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা এই প্রণালিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ২ মার্চ ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী প্রণালিটি বন্ধ ঘোষণা করে। তারা সতর্ক করে, কোনো জাহাজ প্রবেশ করলে হামলা চালানো হতে পারে। এর ফলে সামুদ্রিক চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং জাহাজ বিমার খরচ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।
তবে শুধু জ্বালানি নয়, এই অঞ্চলকে এখন ‘ডিজিটাল চোকপয়েন্ট’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ, এখান দিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবল গেছে। এগুলোর মাধ্যমে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে ডেটা আদান–প্রদান হয়।
এই কেবলগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্যালকন, সি-মি-উই-৪, আই-মি-উই এবং ইউরোপ-পার্সিয়া এক্সপ্রেস গেটওয়ে। এসব কেবল ভারতের মুম্বাই ও চেন্নাইসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন শহরকে বৈশ্বিক ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত রাখে। বিশেষজ্ঞদের হিসেবে, এই অঞ্চলের কেবলগুলো দিয়ে বিশ্বব্যাপী মোট ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ৩৭ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
এ কারণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও বিকল্প পথ তৈরিতে বিনিয়োগ করছে। গুগল ও মেটার মতো প্রতিষ্ঠান নতুন সাবমেরিন কেবল প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যাতে একটি পথ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য পথ দিয়ে সংযোগ সচল রাখা যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রণালি বন্ধ হলে বাংলাদেশের ইন্টারনেটে কতটা প্রভাব পড়বে। টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তাদের মূল কেবল সরাসরি এই পথ দিয়ে যায় না। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ডেটা ট্রাফিক প্রধানত লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর হয়ে প্রবাহিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু ইন্টারনেট নয়, ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড ব্যবসার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে সরাসরি ও পরোক্ষ— দুই ধরনের প্রভাবই পড়তে পারে ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থায়।
আপনার মতামত লিখুন :