প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম
বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও সীমান্তঘেঁষা বৈচিত্র্যের জন্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। হিমালয় পর্বতমালার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এই জেলাকে প্রায়ই বলা হয় ‘হিমালয়ের কন্যা’। শীতকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে দূরে দেখা যায় পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারঢাকা চূড়া। তাই ঈদুল ফিতর–এর ছুটিতে অনেকেই ভ্রমণের জন্য এই শান্ত ও মনোরম জেলাটিকেই বেছে নেন।
পঞ্চগড়ে ঘুরে দেখার মতো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্থান নিচে তুলে ধরা হলো—
মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন: মির্জাপুর শাহী মসজিদ
এই ঐতিহাসিক মসজিদটি অবস্থিত পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে, জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, ১৬৫৬ সালে মুঘল আমলে মসজিদটি নির্মিত হয়। প্রায় ৪০ ফুট লম্বা ও ২৫ ফুট চওড়া এই স্থাপনাটিতে একই সারিতে তিনটি গম্বুজ এবং চার কোণে মিনার রয়েছে। দেয়ালের টেরাকোটার কারুকাজগুলো ভিন্ন ভিন্ন নকশায় তৈরি, যা ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
ইতিহাসের স্মারক: মহারাজার দিঘী
পঞ্চগড় সদর উপজেলার ভিতরগড় এলাকায় প্রায় ৫৪ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল দিঘির বয়স প্রায় দেড় হাজার বছর বলে ধারণা করা হয়। দিঘির চারপাশে সবুজ গাছপালা, উঁচু পাড় ও ইটবাঁধানো ঘাট দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, পৃথু রাজা আত্মসম্মান রক্ষার্থে পরিবারসহ এই দিঘিতে আত্মাহুতি দেন।
সমতলের সবুজ: পঞ্চগড়ের চা বাগান
পাহাড়ি এলাকার বাইরে সমতলভূমিতে চা বাগানের জন্য পঞ্চগড় এখন বেশ পরিচিত। ২০০০ সাল থেকে এখানে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। সারি সারি চা গাছের সবুজ দৃশ্য পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। বিশেষ করে কাজী এন্ড কাজী, এমএমটি, স্যালিলনসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির টি স্টেট দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করবে।
সীমান্তের অভিজ্ঞতা: বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট
তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত এই স্থানটি বাংলাদেশের সর্বউত্তরের স্থলবন্দর এলাকার কাছাকাছি। এখানে দাঁড়িয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের আবহ অনুভব করা যায়।
শনিবার ও মঙ্গলবার বিকেলে সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের যৌথ প্যারেড দেখতে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। কাছেই ভারতের ফুলবাড়ী আর শিলিগুড়ি শহরের দূরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটার।
দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর: রকস মিউজিয়াম
পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরটি বাংলাদেশের একমাত্র পাথর জাদুঘর। এখানে আগ্নেয় ও পাললিক শিলা, খনিজবালি, প্রাচীন মুদ্রা, পোড়ামাটির নিদর্শনসহ এক হাজারের বেশি সংগ্রহ রয়েছে। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যবহার্য সামগ্রী এবং বহু পুরোনো নৌকাও সংরক্ষিত আছে।
নদীতীরের সৌন্দর্য: তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো
তেঁতুলিয়া শহরের পাশে মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক ডাক বাংলোটি ভিক্টোরিয়ান ধাঁচে নির্মিত। উঁচু স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে নদী ও আশপাশের প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। শীতের দিনে এখান থেকেই দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়াও দেখা সম্ভব।
প্রাচীন তীর্থস্থান: বোদেশ্বরী মন্দির
বোদা উপজেলার করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দিরটি প্রায় ২ দশমিক ৭৮ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। জনশ্রুতি আছে, এই মন্দিরকে ঘিরেই বোদা উপজেলার নামকরণ হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।
যেভাবে যাবেন
ঢাকার শ্যামলী, গাবতলী ও মিরপুর থেকে নাবিল পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন বাসে সরাসরি পঞ্চগড় যাওয়া যায়। ভাড়া নন-এসি ৯০০-১১০০ টাকা এবং এসি ১৭০০-১৯০০ টাকার মধ্যে।
ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, একতা ও দ্রুতযান এক্সপ্রেসে ভ্রমণ করা যায়। শ্রেণিভেদে ভাড়া ৭৪০ থেকে ২৫৯৮ টাকা পর্যন্ত।
কোথায় থাকবেন
পঞ্চগড় জেলা শহরে সেন্ট্রাল গেস্ট হাউজ, হোটেল মৌচাক, হোটেল রাজনগর, হিলটন বোর্ডিং, এইচ কে প্যালেস ও হোটেল প্রীতমসহ বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। এ ছাড়া আগাম অনুমতি নিয়ে তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো বা সরকারি রেস্ট হাউসেও থাকা যায়।
আপনার মতামত লিখুন :