প্রকাশিত: মার্চ ২১, ২০২৬, ১০:২৯ পিএম
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দর্শনার্থীদের জন্য সাজানো হয়েছে নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি কুমিল্লার অর্ধশতাধিক ঐতিহাসিক ও বিনোদন কেন্দ্র। নগরীর বাইরে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বিনোদন কেন্দ্রগুলো এবারের ঈদে দর্শনার্থীদের কোলাহলে মুখর থাকবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রগুলোর কর্তৃপক্ষরা। এতে জেলা পুলিশ ও টুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
এ বছর ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে ঘর থেকে দু’পা বাইরে ফেলে আপনিও পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন অসংখ্য প্রাকৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ নিদর্শনসমৃদ্ধ নয়নাভিরাম অপরূপ সৌন্দর্যের সমাহারে বিস্তৃত কুমিল্লা।
কুমিল্লার যেসব স্থানসমূহ আপনাকে মুগ্ধ করবে: কুমিল্লা শহর থেকে ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে কোটবাড়ি, লালমাই ও ময়নামতি এলাকায় রয়েছে বেশ কিছু সরকারি বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্র ও স্থাপনা। এখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপিত ব্লু ওয়াটার পার্ক ও ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্ক। এখানে রয়েছে পানির ফোয়ারা, শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইড, পাহাড় থেকে কৃত্রিম উপায়ে পানির ঝর্ণাধারা, হাতি, অজগর, কুমিরসহ বিভিন্ন পশুপাখির দৃষ্টিনন্দন প্রতিকৃতি। কোটবাড়ি এলাকায় রয়েছে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি-বার্ড। এটি বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের সূতিকাগার। বার্ডের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে ফি লাগে না, তবে অনুমতি নিতে হয়। বার্ডের ভেতরের দুই পাহাড়ের মাঝখানে আছে নির্জন প্রকৃতির ‘বনকুটির’, এর পাশেই আছে এক অকৃত্রিম ভালো লাগার অনিন্দ্য সুন্দর ‘নীলাচল পাহাড়’। কোবাড়িতে আছে অষ্টম শতকের অসংখ্য পুরাকীর্তি। এখানকার দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন স্পটের মধ্যে ‘শালবন বিহার’, ‘নবশালবন বিহার’ ও ‘বৌদ্ধ বিহার’ অন্যতম। শালবন বিহার দেখার পর প্রায় ৪ কিলোমিটার উত্তরে দেখতে পাবেন ‘কোটিলামুড়া’। এর প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সেনানিবাস এলাকায় ‘চারপত্র মুড়া’। প্রায় ৩৫ ফুট উঁচু একটি ছোট ও সমতল পাহাড়ের চূড়ায় এর অবস্থান। এছাড়াও রয়েছে ‘রূপবান মুড়া’। রয়েছে ‘ময়নামতি যাদুঘর’। যাদুঘরের পাশে রয়েছে বন বিভাগের দুইটি পিকনিক স্পট।
এছাড়া লালমাই পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্তের পাহাড় চূড়ায় আছে ১৩শ’ বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী দুইটি ‘চন্ডি মন্দির’। ১৭শ’ শতাব্দীতে রাজা গোবিন্দ মাণিক্যের অনুজ জগন্নাথ দেবের মেয়ে দুতিয়া দেবী এ দুটি মন্দির নির্মাণ করেন। এর অদূরেই রয়েছে বিশাল ‘দুতিয়া দীঘি’। পাহাড়ের উত্তর প্রান্তে আছে ‘ময়নামতি রাণির বাংলো’, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ‘ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি’।
কুমিল্লা নগরের বাদুরতলায় রয়েছে ‘ধর্মসাগর’ দীঘি। প্রায় সাড়ে ৫শ’ বছর আগে ত্রিপুরা রাজ্যের মহারাজ ধর্মমানিক্য এটি খনন করেন। এর উত্তরপাড়ে আছে ৫ একরের কুমিল্লা ‘নগর পার্ক’। এর উত্তর-পূর্ব কোণে আছে ‘রাণীর কুটির’ এবং একটি ‘শিশু পার্ক’ ও ‘নজরুল ইন্সটিটিউট কেন্দ্র’। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে এ দীঘির পাড়ে। প্রাণখুলে সময় কাটানোর জন্য এক অসাধারণ স্থান ধর্মসাগর পাড়। এখানে নৌকায়ও ভ্রমণ করা যায়। এছাড়া মোগলটুলি এলাকায় আছে ঐতিহাসিক ‘শাহ্ সুজা বাদশাহ্ মসজিদ’। নগরের বাদুরতলায় ভাষা সৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি, দক্ষিণ চর্থায় ভারতীয় উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী শচিন দেব বর্মনের বাড়ি, বাগিচাগাঁয়ে আছে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের অন্যতম নেতা অতীন রায়ের বাড়ি। আছে কেটিসিসি পর্যটন কেন্দ্র, জগন্নাথ মন্দির, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত অনেক স্থান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মণ্ডিত গোমতী নদী। পাখি আর বিভিন্ন বন্যপ্রাণী দেখতে হলে যেতে পারেন রাজেশপুর ইকোপার্কে। নূরজাহান ইকো পার্ক, লালমাই লেকল্যান্ড। এছাড়া আছে কুমিল্লার ঐতিহ্যের বিজয়পুরের ‘মৃৎশিল্প’। এখান থেকে কম টাকায় মাটির তৈরির ফুলের টব, ফুলদানি, হাঁসটব, লম্বা ও গোল ছাইদানি, চায়ের কাপ, প্লেট ও নকশাদার বাতি, মাছ, ক্যাঙ্গারুসহ অনেক কিছু কিনতে পারবেন।
লাকসামের পশ্চিমগাঁওয়ে আছে নারী জাগরণের পথিকৃৎ নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর বাড়ি এবং দেবিদ্বারের এলাহাবাদে ‘ত্রিশ আউলিয়ার মাজার’।
মুরাদনগরের কবিতীর্থ দৌলতপুরে যেতে পারেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিজড়িত নিদর্শনসমূহ দেখার জন্য।
কোথায় থাকবেন-খাবেন: কুমিল্লার বিখ্যাত স্থানসমূহ দেখার জন্য কমপক্ষে তিন দিন সময় লাগবে। তাই আসার পরিকল্পনার সঙ্গে রাত যাপনেরও পরিকল্পনা করুন। থাকতে ও খেতে পারেন কোটবাড়ি বার্ড, নগরীর হোটেল নূরজাহান, ময়নামতি, রেড রুফ ইন, কিউ প্যালেস, এলিট প্যালেস, ভিক্টোরি, ওয়েসিস, গ্র্যান্ড ক্যাসেলেসহ নগরীতে দুই হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত রাত্রি যাপনের সুযোগ আছে।
কিভাবে আসবেন কুমিল্লায়: দেশের যে কোনো স্থান থেকে কুমিল্লা আসার জন্য আপনি রেলপথ বা সড়কপথ বেছে নিতে পারেন। কুমিল্লা নগরী ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ময়নামতি কিংবা কোটবাড়ি মোড়ে নেমে সহজেই এসব বিনোদন কেন্দ্রে যাতায়াত করা যায়।
কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, এ জেলা প্রাকৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদে ভরপুর। ঈদ উপলক্ষে ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা হয়েছে। যেকোনো সমস্যায় পুলিশের জরুরি সেবা ৯৯৯ এ কল করারও তিনি পরামর্শ দিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :