আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের উৎপাদিত উচ্চ ফলনশীল পেঁয়াজ বীজের মাধ্যমে সাফল্যের নতুন দিগন্ত খুলেছেন মেহেরপুরের কৃষকরা। নাসিক, ভারতীয় কালাস ও সুখসাগরসহ বিভিন্ন উন্নত জাতের পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের ফলে একদিকে যেমন কমছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে বাড়ছে লাভের পরিমাণ। নিজের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় বীজ সরবরাহ করে অতিরিক্ত আয়ও করছেন তারা।
এক সময় পেঁয়াজ বীজের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন জেলার কৃষকরা। পেঁয়াজ চাষের মৌসুম এলেই চড়া দামে বীজ কিনতে হতো। অনেক সময় ভেজাল বীজের কারণে লোকসান গুনতে হয়েছে। তবে বর্তমানে সেই চিত্র বদলেছে। কৃষকরা নিজেরাই উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত নভেম্বর মাসে বীজ বপন, জানুয়ারিতে পেঁয়াজ সংগ্রহ এবং মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের প্রথম দিকে বীজ উৎপাদন করা হয়। পেঁয়াজ ফুলে হাত দিয়ে পরাগায়নের (হস্ত পরাগায়ন) মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে, যা ফলন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ কার্যক্রমে স্থানীয়ভাবে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও লাভজনক হয়ে উঠেছে এই চাষ। এক বিঘা জমিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে কৃষকরা দেড় লাখ টাকার মতো বীজ বিক্রি করতে পারছেন। প্রতি কেজি পেঁয়াজ বীজ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা দরে। প্রতি বিঘায় গড়ে ৪ থেকে ৫ মণ বীজ উৎপাদন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
জেলার কালীগাংনী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা ফারুক হোসেন বলেন, আগে ভারত থেকে আমদানি করা বীজ কিনতে হতো। এক বছর ভালো বীজ এলেও দেখা যাচ্ছে পরের বছর মান খারাপ হয়ে যেত। দামও বেশি ছিল, ঝুঁকিও ছিল। এখন আমরা নিজেরাই বীজ উৎপাদন করছি। এতে খরচ কমছে, লাভ বাড়ছে।
ভিটাপাড়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন এখন আমাদের জন্য লাভজনক চাষে পরিণত হয়েছে। সরকারি সহায়তা বাড়লে আমরা আরও বড় পরিসরে উৎপাদন করতে পারব। হস্ত পরাগায়নের কারণে ফলনও ভালো হচ্ছে। এতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
আনন্দবাস গ্রামের কৃষক বিপ্লব হোসেন বলেন, পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করে আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি লাভ হচ্ছে। নিজের জমির বীজ নিজেই ব্যবহার করতে পারছি, ফলে খরচ কমে গেছে। আগে বাইরে থেকে বীজ আনতে হতো, দাম বেশি ছিল, ভালো বীজ পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হত। এখন নিজেই উৎপাদন করছি, পাশাপাশি অন্যদের কাছেও বিক্রি করে বাড়তি আয় হচ্ছে।
বন্দর গ্রামের কৃষক সরোয়ার হোসেন বলেন, পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনে ঝুঁকি কম এবং লাভ বেশি। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। এজন্য এখন অনেক কৃষকই এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের আরও প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা পেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, দেশেরও উপকার হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মেহেরপুর জেলায় প্রায় ৩০০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ বীজের চাষ হয়েছে। পাশাপাশি ২৭ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা বলেন, কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে কৃষকদের হস্ত পরাগায়নের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এটি সঠিকভাবে করতে পারলে ফলন অনেক ভালো হয়। এছাড়া বীজ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
উন্নত জাতের পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে মেহেরপুর। কৃষকদের এই উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক পেঁয়াজ উৎপাদনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।