রংপুর নগরীসহ আশপাশের এলাকায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রিতে চরম বিশৃঙ্খলার অভিযোগ উঠেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এপ্রিল মাসের জন্য নতুন মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তব বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই। উল্টো নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি সিলিন্ডারে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের।
গত ২ এপ্রিল বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৭২৮ টাকা নির্ধারণ করে।
মার্চ মাসে দাম ছিল ১,৩৪১ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রপেন ও বিউটেনের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়ানো হয়। তবে এই দাম বৃদ্ধির পরও বাজারে শৃঙ্খলা ফেরেনি; বরং নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রংপুর নগরীর ১২ কেজি সিলিন্ডার ১,৯০০ থেকে ২,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে দাম ২,৩০০ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পাড়া-মহল্লা ও গ্রামীণ ছোট দোকানগুলোতে এই বাড়তি দামের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
নগরীর বেতপট্টি মোড় ও লালবাগ এলাকার খুচরা বিক্রেতারা জানান, তারা ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। বিক্রেতা আবদুল মান্নান বলেন, “কম্পানির ডিলাররা সরকারি দামে পণ্য দিচ্ছেন না।
পরিবহন খরচ, অতিরিক্ত কমিশন ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে বেশি দামে বিক্রি ছাড়া উপায় নেই।”
তবে ভোক্তারা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং তদারকির অভাবের সুযোগে একাধিক স্তরে অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া হচ্ছে। এক ভোক্তা বলেন, টিভি-পত্রিকায় এক দাম দেখি, দোকানে গেলে অন্য দাম শুনতে হয়। এটি স্পষ্ট প্রতারণা। কার্যকর নজরদারি না থাকায় আমরা প্রতিনিয়ত ঠকছি।
রংপুর মেডিকেল পূর্বগেট এলাকার গৃহিণী শাহনাজ পারভীন বলেন, আজ ২,২৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। দরদাম করারও সুযোগ নেই। প্রয়োজনের কারণে বেশি দামে কিনতেই হচ্ছে।
নগরীর লালবাগ এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, দাম ঘোষণার পরদিনই ২,২০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার নিতে হয়েছে। ঘোষিত দাম বাস্তবে কোনো কাজে আসছে না।
শুধু শহরেই নয়, গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কেরানীরহাট এলাকার বাসিন্দা অনীল চন্দ্র জানান, সেখানে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২,২০০ থেকে ২,৩০০ টাকায়। ছোট দোকানগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কেউ দেখার নেই —তিনি অভিযোগ করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে অস্বচ্ছতা রয়েছে। ডিলার পর্যায়ে সরকারি দামে সরবরাহ না হওয়া, পরিবহন ব্যয়ের অজুহাত এবং খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে শেষ পর্যন্ত এর পুরো চাপ ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
ভোক্তারা মনে করেন, মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। তারা নিয়মিত ও কঠোর তদারকির দাবি জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, ডিলার থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত স্বচ্ছ মূল্য শৃঙ্খলা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের নৈরাজ্য বন্ধ করা কঠিন।
রংপুর জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বাজার পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগে ইতিমধ্যে শহরের দুই ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে। আমাদের অভিযান ও মনিটরিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”