পরিকল্পিতভাবে রাজধানীর মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের স্টোর রুমে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার ভোররাতে আসমাউল ইসলাম নামে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিজের পরিচয় আড়াল করতে বোরকা পরে সেখানে আগুন দেয়। ওই আগুন দিতে তার সঙ্গে ৫ লাখ টাকার চুক্তির তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ।
শিক্ষা অধিদপ্তরের দ্বিতীয় তলার যে স্টোর রুমে আগুন দেওয়া হয়, সেখানে ৭৩৫টি ল্যাপটপ ছিল। যেগুলো মাঠ পর্যায়ে বিতরণের জন্য রাখা হয়েছিল। আগুনে ১৪০টি ল্যাপটপ পুরোপুরি পুড়ে যায়। ২৯টির বেশির ভাগ অংশ এবং ৩৩টি ল্যাপটপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪৫০টি ল্যাপটপ অক্ষত। হিসাব অনুযায়ী বাকি ৮৩টি ল্যাপটপের হদিস মেলেনি।
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কর্মকর্তা ও স্টোর ইনচার্জ জিন্নাত আলী বিশ্বাস ছাড়াও যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা হলেন অধিদপ্তরের পরিচ্ছন্নতাকর্মী আসমাউল ইসলাম ও স্টোর কিপার হুমায়ুন কবির খান।
এদিকে আগুনের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে মিরপুর থানার ওসি মোহাম্মদ গোলাম আজমকে প্রত্যাহার করে ডিএমপির কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ সদরদপ্তর ও প্রশাসন বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে।
গতকাল মিন্টো রোডে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসি মোস্তাক সরকার বলেন, বোরকা পরিহিত অবস্থায় আগুন দিয়েছে আসমাউল। তার সঙ্গে সেখানে কর্মরত আরও অন্তত তিনজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। স্টোর রুমে রক্ষিত ল্যাপটপ ও মালপত্রের ক্ষতি করতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। আগুনে ২-৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে জড়িত একজনকে চিহ্নিত করে পুলিশ।
পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, মূল যে মোটিভ এবং পরিকল্পনায় তাদের বাইরে আর কেউ আছে কিনা, সেগুলো বের করতে কাজ করছি। তাদেরকে হেফাজতে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে আবেদন করব।
তিনি বলেন, এ কাজের জন্য ৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে নগদ ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে সে বিভিন্ন জিনিস কিনেছে। এ তথ্যগুলো আছে। জিনিসগুলো উদ্ধারসহ অন্যান্য কাজ করতে একটু সময় লাগবে।
৮৩টি ল্যাপটপের হদিস না মিললেও সিসিটিভি ভিডিওতে সেখান থেকে কোনো কিছু সরানোর প্রমাণ পায়নি পুলিশ।
ল্যাপটপ কেনাকাটার দুর্নীতি, নাকি অডিটের তথ্য আড়াল করতে পরিকল্পিত আগুন– তা নিয়ে তদন্ত চলছে। মিরপুর-১ নম্বরের একটি দোকান থেকে বোরকা কেনা হয়। সেই বোরকা পরিহিত অবস্থায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শুক্রবার অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন বাদী হয়ে মিরপুর থানায় মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, আগুন লাগার খবরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্টোর রুমের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। কিছু সময়ের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ পরিদর্শন করেন। সেখানে দেখা যায়, কক্ষের এসি, সংরক্ষিত ল্যাপটপ ও বিভিন্ন মালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ কর্মকর্তারা দেখতে পান, রাত আনুমানিক ২টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টার মধ্যে বোরকা পরিহিত এক ব্যক্তি কৌশলে স্টোর রুমের তালা খুলে ভেতরে ঢোকে। সে মোট পাঁচবার কক্ষে প্রবেশ করে। শেষবার বের হওয়ার সময় কক্ষে আগুন লাগিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
মামলার বাদী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পিটিআইতে সরবরাহ করার জন্য ল্যাপটপগুলো কিনে স্টোর রুমে রাখা হয়েছিল।
ওসি প্রত্যাহার
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মিরপুর থানার ওসি মোহাম্মদ গোলাম আজমের বিরুদ্ধে আগে থেকে বেশ কিছু অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগে তাঁকে সরিয়ে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তাঁর দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি সামনে আসে। আগুন লাগার অনেক পর তিনি ঘটনাটি জানতে পারেন। এ ছাড়া শুক্রবার দুপুরে শিক্ষামন্ত্রী ঘটনাস্থলে গেলেও তিনি অনেক পর সে বিষয়ে অবগত হন।
২৬ এপ্রিল মিরপুরের উত্তর বিশিলের সামসাদ আরা সাথী নামে এক নারী ডিএমপির কমিশনারের কাছে ওসির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগে বলেন, মিরপুরে স্বাধীন বাংলা মার্কেটে চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখল নিয়ে ঝামেলা চলছিল। প্রতিপক্ষরা তাদের লোকজনের ওপর কয়েকবার হামলা করে। এ ঘটনায় ওই নারী মিরপুর থানায় মামলা করতে যান। মামলার খরচ হিসাবে দুই দফায় তিনি ওসিকে পাঁচ লাখ টাকা দেন। সামসাদ আরা সাথী বলেন, ‘টাকা দিলেও ওসি কোনো সহযোগিতা করেননি।’