‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?`— মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিখ্যাত পঙক্তিটি যেনো বারবার ঘুরে ফিরে আসে। তবে কিছু মানুষের মৃত্যু হলেও তারা থেকে যান হাজারো হৃদয়ে। তেমনি একজন অভিনেতা শামস সুমন। হাজারো ভক্ত ও সহকর্মীকে কাঁদিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন এই অভিনেতা। আজ বৃহস্পতিবার বাদ ঈশা রাজশাহীর হেতেম খাঁ কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
ভক্ত-সহকর্মী শ্রদ্ধা
৬১ বছর বয়সী শামস সুমন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বুধবার সকালে রাজধানীর চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় তার প্রথম জানাজা। সেখানে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দ্র মজুমদার, আফজাল হোসেন, অভিনয় শিল্পী ওমর সানী, জাহিদ হাসান, মীর সাব্বির, জিতু কমল, ত্রপা মজুমদার, নাদের চৌধুরী, ইন্তেখাব দিনার, দীপা খন্দকার, শতাব্দী ওয়াহিদ, আবুল কালাম আজাদ, আহসান হাবিব নাসিম, গোলাম ফরিদা চন্দাসহ সহকর্মী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকে। প্রিয় মানুষকে শেষ বিদায় জানাতে এসে কাঁন্নায় ভেঙে পড়েন কেউ কেউ।
আবেঘন কণ্ঠে জাহিদ হাসান বলেন, ‘হঠাৎ ওর মৃত্যুর খবর শুনে পুরো রাত ঘুমাতে পারিনি। আমি মিডিয়াতে আগে এসেছি; কিন্তু শামস সুমন পৃথিবীতে আমার আগে এসেছে। ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিলো দারুণ। ওকে দেখে মাঝে মাঝে ভাবতাম, মানুষ এতো ভালো হয় কীভাবে? যেখানেই থাকুক সুমন যেনো ভালো থাকে।’
সালাহউদ্দিন লাভলু বলেন, ‘শামস সুমনের অসংখ্য স্মৃতি জমে আছে। সেসব এক এক করে মনে পড়ছে। কী বলব! কী বলার আছে? তার চলে যাওয়াতে মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছি। কত আড্ডা দিয়েছি জীবন চলার পথে। বড় কথা হচ্ছে, শামস সুমন সবার প্রিয় ছিলেন। ছোট বড় সবার প্রিয় হওয়া কঠিন। কিন্তু তিনি তা ছিলেন। কোনোদিন কারও বিরুদ্ধে একটি কথাও বলতে দেখিনি। প্রিয় মানুষটি এত দ্রুত হারিয়ে গেলেন! মেনে নিতে পারছি না।’
স্ত্রী-সন্তানের জন্য অপেক্ষা
শামস সুমনের বড় ছেলে জুবায়ের শামস শাহিল লন্ডনে মেডিকেল কলেজে পড়ছেন। ছোট ছেলে জুবায়েদ শামস সাফিন পড়ছে ‘ও’ লেভেলে। মেয়ে সায়ান শামস ‘এ’ লেভেলের শিক্ষার্থী। শামস সুমনের মৃত্যুর খবর শুনেই লন্ডন থেকে ঢাকায় রওনা দেন তারা। স্ত্রী-সন্তানের আসার খবর শুনে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের হিমঘর রাখা হয় সুমনকে। আজ সকালে রওনা দিয়ে সুমনের লাশবাহী গাড়ি রাজশাহী নগরের ঝাউতলা মিঠুর মোড়ের বাড়িতে পৌঁছে দুপুরে। সেখানে হয় দ্বিতীয় জানাজা। এ সময় বহু মানুষ তার মরদেহ দেখতে ভিড় করেন। স্ত্রী-সন্তানের রাজশাহীতে পৌছুলে সন্ধ্যার পর তার দাফন সম্পন্ন হয়।
সুমনের বেড়ে ওঠা ও উচ্চশিক্ষা
রাজশাহীতেই জন্ম অভিনেতা সুমনের। বেড়ে ওঠাও রাজশাহীতে। ১৯৮২ সালে তিনি বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে রাজশাহীর গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেন। মেধাতালিকায় রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯৮৪ সালে বাণিজ্য বিভাগ থেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন রাজশাহী কলেজ থেকে। পরে তিনি মার্কেটিং বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।
অভিনয়-আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে সুনাম
ছেলেবেলায় তিনি রাজশাহীতে বাংলাদেশ বেতারের অভিনয় ও আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে সুনাম কুড়ান। তিনি রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠন স্বননের সদস্যও। পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় পাড়ি দেন। প্রথম দিকে মঞ্চনাটক করেন। পরে ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা হয়ে ওঠেন।
চলচ্চিত্র
‘মন জানে না মনের ঠিকানা’, ‘কক্সবাজারে কাকাতুয়া’, ‘চোখের দেখা’, ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’, ‘আয়না কাহিনী’, ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, ‘জয়যাত্রা’, ‘নমুনা’ এবং ‘হ্যালো অমিত’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেন শামস সুমন। পরে আরও কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
জাতীয় শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি
২০০৮ সালে `স্বপ্নপূরণ` চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
বিরতি ও ফিরতে চাওয়ার আক্ষেপ
এতো নাটক-সিনেমায় কাজ করার পরও শামস সুমন ধীরে ধীরে চলে যান আলোচনার বাইরে। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শামস সুমন বলেন, ‘মধ্যবয়সী শিল্পীদের চাহিদা কমে যাওয়াই এর একটি বড় কারণ। মাথায় টাক পড়লে হয়তো বাবা চরিত্রে ডাক পেতাম, কিন্তু সেটা হয়নি। বর্তমানে টিভি, ওটিটি ও ইউটিউবকেন্দ্রিক নাট্যচর্চা, যেগুলোর সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছি না। না সংলাপ, না চরিত্র, না কাহিনি! তবে চেষ্টা করছি, কীভাবে ফিরে আসা যায়। ক্যামেরা তো ভুলতে পারব না।’ অভিনেতা শামস সুমনের সেই ‘ফিরে আসা’ আর হলো না।
আপনার মতামত লিখুন :