দলের সাংগঠনিক কাজ গতিশীল করতে দীর্ঘ এক দশক পর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এ নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটি। আগামী ঈদুল আজহার পর এ কাউন্সিল হওয়ার কথা।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সীমাবদ্ধতায় নির্দিষ্ট সময়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ষষ্ঠ কাউন্সিল হয়েছে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এবারে হবে সপ্তমবারের মতো।
বিগত দিনে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের দলীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই কর্মসূচি ছিল সংকুচিত। সব আয়োজন ছিল সাদামাটা। তাই নিজেদের অনুকূল পরিবেশের কারণে এবার থাকবে ভিন্নমাত্রা। উৎসবের আমেজ রাজধানীর পাশাপাশি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ঘোষণা হবে নতুন নেতৃত্ব। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারা অনুযায়ী ৮ বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা তারেক রহমান। তবে গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর গত ৯ জানুয়ারি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি ভারমুক্ত হয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।
আর মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্বগ্রহণ করেন ২০১৬ সালের কাউন্সিলে। এই দুই পদে পুরোনোতেই ভরসা নাকি নতুন মুখ আসবে—তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে স্থায়ী কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদে আসছে নতুন নেতৃত্ব আসছে, এটা প্রায় নিশ্চিত। নতুন কমিটিতে স্থান পাবেন যোগ্য ও ত্যাগীরা। আলোচনায় আছেন অনেকে। পূরণ করা হবে স্থায়ী কমিটির শূন্যস্থানও।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘‘অতীতের চেয়ে এবারের কাউন্সিল নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কারণ বিগত ফ্যাসিবাদের সময় আমাদের সাংগঠনিক কাজে নানা প্রতিকূলতা ছিল। তাই কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হতো সাদামাটা। আশা করি এবারের কাউন্সিল হবে উৎসবমুখর। এতে দলের সর্বস্তরে আসবে নতুন নেতৃত্ব।’’ তিনি জানান, শিগগিরই কাউন্সিলের পথনকশা ঘোষণা করা হবে।
বিগত দিনে শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন যারা
দলের সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত ৬টি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করেছে দলটি। এর মাধ্যমে নির্বাচন করা হয় শীর্ষ নেতৃত্ব।দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা। তবে বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং দলীয় নানা সীমাবদ্ধতায় তা নির্ধারিত সময়ে করা সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যে প্রথম কাউন্সিল হয়েছে ১৯৭৮ সালের ১-২ সেপ্টেম্বর। এতে জিয়াউর রহমান দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। তার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালের ২৬-২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কাউন্সিলে চেয়ারম্যান হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। এরপর ৮৪ সালের পর থেকে দায়িত্ব পান খালেদা জিয়া। তৃতীয় ১৯৮৮ সালের ৩-৪ মার্চ, চতুর্থ ১৯৯৩ সালের ৪-৫ সেপ্টেম্বর ও পঞ্চম কাউন্সিল হয় ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। সেখানে পুনরায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া।
সর্বশেষ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ হয়েছে ষষ্ঠ কাউন্সিল। সেবারও চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। আর মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমৃত্যু চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন খালেদা জিয়া।
তারেক রহমানের অভিষেক
২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে পদাধিকার বলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান তার বড় ছেলে তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এরই মধ্যে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩০ ডিসেম্বর মারা যান খালেদা জিয়া। এরপর চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়।
শূন্যস্থানে আলোচনায় যারা
বিএনপির দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এবারের সপ্তম কাউন্সিলে দলের স্থায়ী কমিটির শূন্যপদ পূরণ করা হবে। এতে স্থান পেতে পারেন বেশ কয়েকজন নেতা। এর মধ্যে আলোচনায় আছেন রুহুল কবির রিজভী, শামসুজ্জামান দুদু, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, জয়নুল আবদিন, জয়নুল আবদীন ফারুক, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও হাবিবুন নবী খান সোহেল। আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যাও বাড়ানো হতে পারে।
স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ চিত্র
বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটি একাধিক ফোরামে বিভক্ত। স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। সর্বশেষ ২০১৬ সালের কাউন্সিলের আগে স্থায়ী কমিটির সদস্যের পদ রাখা হয় ১৯টি। তবে নানা কারণে পুরোপুরি কোরাম পূরণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৬ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী এ ফোরামে ছিলেন ১৬ জন। সে সময় নতুন করে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
এরই মধ্যে মারা গেছেন খালেদা জিয়া। আর স্পিকারের দায়িত্ব পাওয়ায় পদ ছাড়েন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা হলেন—পদাধিকার বলে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও এজেডএম জাহিদ হোসেন।
সাংগঠনিক কাজে অনেকেই সক্রিয় থাকলেও কয়েক বছর শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। গত রমজান থেকে অসুস্থ হয়ে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন আরেক সদস্য মির্জা আব্বাস।
আবারও চেয়ারম্যান ও মহাসচিব তারেক রহমান-মির্জা ফখরুল?
সর্বশেষ ২০১৬ সালের কাউন্সিলের আগে দলীয় প্রধান হিসেবে খালেদা জিয়ার বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়নি। এবারও তারেক রহমানের বিকল্প রাখা হবে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একটি পক্ষের দাবি, মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলই থাকতে পারেন।
তারেক রহমান চেয়ারম্যান হয়েছেন একবছরও পূর্ণ হয়নি। নতুন কাউন্সিলে তাকেও কি নির্বাচিত হতে হবে—জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘‘অবশ্যই, বর্তমান চেয়ারম্যানকেও নতুন করে নির্বাচিত হতে হবে। আর মহাসচিবের ক্ষেত্রেও একই নীতি অবলম্বন করা হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘অতীতের মতো এবারও নেতৃত্ব বাছাই হবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে।’’