ঢাকা শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩২
amaderkhobor24.com

কালোবাজারে লঞ্চের কেবিন, যাত্রীরা বলছেন ভাড়াও বেশি

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: মার্চ ২৭, ২০২৬, ১০:৫১ এএম

কালোবাজারে লঞ্চের কেবিন, যাত্রীরা বলছেন ভাড়াও বেশি

‌‘রমজান এলেই যেমন সব ধরনের ব্যবসায়ী ক্রেতাদের পকেট কাটতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তা চলে ঈদযাত্রাতেও। ঈদের আগে-পরে অন্তত ১৫ দিন যাত্রাপথে যাত্রীদের পকেট কাটেন পরিবহন ও লঞ্চ মালিকরা। সারা বছর বরিশাল-ঢাকা নৌপথে লঞ্চ ভাড়া নেওয়া হয় ২০০-২৫০ টাকা। আর ঈদ এবং ফিরতিযাত্রায় নেওয়া হয় ৩০০ টাকা। যখন যাত্রী কম থাকে তখন ভাড়াও কম। যখন যাত্রীতে লঞ্চগুলো ভরপুর থাকে তখন ভাড়া গুনতে হয় বেশি। এটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর এভাবে চলছে।’

কথাগুলো বলেছেন বরিশাল নদীবন্দর ঘাট থেকে লঞ্চে ওঠা ডেকের একাধিক যাত্রী। তাদের ভাষ্যমতে, সারা বছর লঞ্চের ডেকের ভাড়া নেওয়া হয় ২০০-২৫০ টাকা। আর ঈদ এলেই নেওয়া হয় ৩০০ টাকা। বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া সুন্দরবন-১৬, সুরভী, কুয়াকাটা, পারাবত-১৮, শুভরাজ, এম খান-৭, মানামী লঞ্চের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। 

 

এ ছাড়া ঈদে ফিরতিযাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে টিকিট কালোবাজারি চক্র। চক্রের দৌরাত্ম্যে লঞ্চের কেবিন যেন সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। কাউন্টারে টিকিট না মিললেও কালোবাজারে পাওয়া যায় বেশি দামে।

 

কুয়াকাটা লঞ্চের যাত্রী ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী রুপম, ঢাকার ব্যবসায়ী আরিফ রহমান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ইসহাক মৃধা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বছরের স্বাভাবিক দিনগুলোতে ডেকের ভাড়া নেওয়া হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ৩০০ টাকা। আর কালোবাজারি চক্র ছাড়া কেবিন মেলে না। 

ভাড়া বেশি নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে লঞ্চের কর্মকর্তাদের জবাব, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম রাখা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়া কত জানতে চাইলে তারা উত্তর দেন ৪০০ টাকা। এখন তো যাত্রী বেশি, ভাড়া তো স্বাভাবিক দিনের মতো নেওয়া যেতো এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেছেন, স্বাভাবিক দিনগুলোতে লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে রাখা হয়। ঈদ মৌসুমে ব্যবসা পূর্ণতা পায়। এজন্য কিছুটা বেশি নেওয়া হয়।

 

একই অভিযোগ করেছেন বরিশাল নৌবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া অন্তত সাতটি লঞ্চের ডেকের যাত্রীরা। তাদের ভাষ্য, ঈদ উপলক্ষে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। 

Capture1

যখন যাত্রীতে লঞ্চগুলো ভরপুর থাকে তখন ভাড়া গুনতে হয় বেশি

তবে লঞ্চের কর্মীদের ভাষ্য, ভাড়া বাড়ানো হয়নি। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম নেওয়া হচ্ছে। স্বাভাবিক দিনে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম নেওয়ায় এখন সেটিকে ভাড়া হিসেবে দেখছেন তারা। স্বাভাবিক দিনে কম নেওয়া হলেও ঈদযাত্রায় সরকার নির্ধারিত ভাড়া অর্থাৎ তারও কম নেওয়া হয়।

সরকার নির্ধারিত ভাড়া কত?

প্রতিটি লঞ্চের সামনে টানানো সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী, ভিআইপি কেবিন ডেকোরেশন এবং সাইজ অনুযায়ী ৭ হাজার থেকে ১১ হাজার টাকা। ডাবল কেবিন এসি-নন এসি ৩ হাজার ২৩২ টাকা। সিঙ্গেল কেবিন এসি-নন এসি ১ হাজার ৬১৬ টাকা। তৃতীয় শ্রেণির ডেকের ভাড়া ৪০৪ টাকা।

কেবিনের যাত্রী সাইফুল ইসলাম ও সালাউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সড়কে দুর্ঘটনার কবল থেকে রক্ষা পেতেই পরিবার-পরিজন নিয়ে লঞ্চে যাতায়াত করেন তারা। ঈদের আগে স্বাভাবিক দিনগুলোতে সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ছিল ১ হাজার টাকা এবং ডাবল কেবিন দুই হাজার টাকা। ঈদের ফিরতি যাত্রায় সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ২ হাজার ৫০০ টাকা। 

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘যে সময় যাত্রীর চাপ থাকে সে সময় কম ভাড়া নিলেই ব্যবসা জমতো। কিন্তু স্বাভাবিক দিনগুলোতে যাত্রীর চাপ কম থাকলে ভাড়া কম নেওয়া হয়, আর যাত্রী বাড়লে বেশি নেওয়া হয়। লঞ্চ ব্যবসায়ীরা উল্টো স্রোতে হাঁটছেন। এজন্য লঞ্চ রেখে মানুষ বাসে যাতায়াত করছেন।’

কালোবাজারে কেবিনের টিকিট

ভাড়া বাড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কালোবাজারে কেবিনের টিকিট বিক্রিও। একটি সিন্ডিকেট লঞ্চ কোম্পানির অফিস স্টাফদের সঙ্গে যোগসাজশে অনলাইনে এবং সরাসরি কেবিনের টিকিট কিনে পরে বিক্রি করছেন। ওসব টিকিট কালোবাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হয়। আর লঞ্চের কাউন্টারগুলোতে গেলে যাত্রীদের বলে দেওয়া হচ্ছে কেবিন নেই। কিন্তু সেই কেবিন মিলছে নৌবন্দরের দালালদের কাছে, তাও দ্বিগুণ দামে।

সরেজমিনে পারাবত, মানামী, আওলাদ, শুভরাজসহ একাধিক লঞ্চের কেবিনের টিকিট কালোবাজারে বিক্রি হতে দেখেছেন বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিনিধি। এমনকি দ্বিগুণ দামে টিকিট নিতে দেখেছেনও। 
 
এ ব্যাপারে আওলাদ লঞ্চের ম্যানেজার শাহাবুদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়া রাখা হচ্ছে। অন্য সময়ে কম নেওয়ায় যাত্রীরা সেটিকে ভাড়া হিসেবে মনে করছেন। ঈদে কোনও লঞ্চে ভাড়া বাড়ানো হয়নি। একই ভাড়া স্বাভাবিক দিনগুলোতেও থাকে, তবে স্বাভাবিক দিনে যাত্রী কম থাকায় ভাড়া কমিয়ে নেওয়া হয়। এজন্য যাত্রীদের মনে হচ্ছে বাড়ানো হয়েছে। আসলে বাড়নি। আর কেবিনের কিছু টিকিট কালোবাজারে বিক্রি হয়, তবে কারা সেটি করছেন, তা আমাদের জানা নেই।’

Capture3

ডেকের ভাড়া আগে নেওয়া হতো ২৫০ টাকা, এখন ৩০০ টাকা

সুন্দরবন লঞ্চের ম্যানেজার জাকির হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকে লঞ্চ মালিকরা লোকসানের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন। এই লোকসান বছরের দুটি ঈদ উৎসব ছাড়া সব দিনগুলোতেই বহন করতে হয়। ওই সময় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অর্থাৎ শুধু খরচ মেটাতে ভাড়া কম নেওয়া হয়। কিন্তু ঈদ উৎসবেও যদি একইভাবে ভাড়া কম নেওয়া হয়, তাহলে সারা বছর লোকসান দিতে হবে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় লঞ্চ মালিক সমিতির সহসভাপতি রেজিন উল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লোকসান দিতে দিতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমাদের। এ কারণে একটি লঞ্চ কেজি হিসেবে বিক্রি করতে হয়েছে। এভাবে আরও বেশ কয়েকটি লঞ্চ কেজি হিসেবে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন মালিকপক্ষ। অনেক মালিক ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় লঞ্চ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বিশেষ করে পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার পর থেকেই এই লোকসানের বোঝা বাড়তে শুরু হয় মালিকপক্ষের।’

যাত্রীদের অভিযোগের বিষয়ে রেজিন উল কবির বলেন, ‘ঈদে স্বাভাবিক দিনগুলোর লোকসান গুছিয়ে নিতে সরকার নির্ধারিত ভাড়া নেওয়ার দাবি করেছিলাম আমরা। সেখান থেকেও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এজন্য তার চেয়েও কম ভাড়া নেওয়া হয়। এরপরও যাত্রীরা অভিযোগ করলে আমাদের করার কিছুই নেই।’ 

তিনি বলেন, ‘একটি লঞ্চ চালাতে হলে জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে প্রায় আড়াইশ’ স্টাফের বেতন তুলতে হয়। কিন্তু স্বাভাবিক দিনগুলোতে বেশিরভাগ কেবিন খালি থাকায় সেই টাকা তোলা সম্ভব হয় না। এ জন্যই বছরের দুই ঈদ উৎসবের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় লঞ্চ মালিকদের।’

ঈদ শেষে চাঁদপুর নৌপথে যাত্রীদের চাপ, ভাড়া কমানোর নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগ

ঈদুল ফিতর শেষে কর্মস্থলে ফিরতে নৌপথে যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। চাঁদপুর নৌ-টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন অর্ধশতাধিক লঞ্চ যাত্রীবোঝাই করে ছেড়ে যাচ্ছে। লঞ্চ ঘাট ঘুরে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদ উপলক্ষে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার ১০ শতাংশ কমানোর নির্দেশনা থাকলেও তা মানছেন না লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। 

ঢাকাগামী এমডি আবে জমজমের যাত্রী আহমদ উল্লাহ বলেন, ‌‘আমি ঢাকা-চাঁদপুর লঞ্চে নিয়মিত চলাচল করি। প্রথম শ্রেণিতে আগে ৩৫০ টাকা ভাড়া নিতো, আজও তাই নিয়েছে। এখানে সরকার কীভাবে ১০ শতাংশ কমালো বুঝলাম না।’

এমডি রহমত লঞ্চের ডেকে বসা যাত্রী রফিক বলেন, ‘স্বাভাবিক দিনগুলোতে ভাড়া ১৮০ টাকা নেওয়া হতো। এখনও তাই নিচ্ছে। এক টাকাও কমেনি। ভাড়া কমানো নিয়ে ছলচাতুরি করা হচ্ছে।’

তবে লঞ্চ কর্তৃপক্ষের দাবি, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা-চাঁদপুর রুটে ডেকের সরকার নির্ধারিত ভাড়া ১৮৮ টাকা হলেও যাত্রীদের কাছ থেকে ১৮০ টাকা নেওয়া হতো। এখন ১০ শতাংশ কমানোর ঘোষণা বাস্তবায়নে সেই ভাড়ার সঙ্গেই সমন্বয় করা হচ্ছে।

বর্তমানে ঢাকা-চাঁদপুর রুটে সাধারণ চেয়ার ভাড়া ২৫০ টাকা, প্রথম শ্রেণি ৩৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৮০০ টাকা এবং ডাবল কেবিন ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারিত করেছে সরকার।

12136

ঈদ শেষে চাঁদপুর নৌপথে যাত্রীদের চাপ, ভাড়া কমানোর নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগ

ভাড়া ১০ শতাংশ কম নেওয়ার দাবি করে এমডি রহমত লঞ্চের মানিক প্রতিনিধি দীন মোহাম্মদ জিল্লু বলেন, কিছুটা যাত্রী বাড়লেও ঈদ শেষ করে মানুষ কর্মস্থলে এবার স্বস্তিতে ফিরছেন। ঢাকা-চাঁদপুর রুটে সরকার নির্ধারিত লঞ্চের ডেকের ভাড়া ১৮৮ টাকা। আমরা ১৮০ টাকা নিতাম। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে সরকার ১০ শতাংশ ভাড়া কমানোর কারণে আমরা ১৭০ টাকা করে ভাড়া আদায় করছি।

যদিও লঞ্চ ঘুরে দেখা যায়, ডেকের ভাড়া আগের মতো ১৮০ টাকাই নিচ্ছে লঞ্চগুলো। প্রথম শ্রেণির ও কেবিনের ভাড়াও স্বাভাবিক সময়ের মতোই আদায় করছে তারা।

লঞ্চের মাস্টার মো. মুস্তাফিজুর রহমানের দাবি, সরকার যাত্রীদের বিশেষ ছাড় দিয়েছে ঈদের আগে চার দিন এবং ঈদের পরের তিন দিন। এই সময় ১০ শতাংশ ভাড়া কম ছিল। সেই সময় শেষ হয়। এখন আগের মতোই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, ভাড়া ১০ শতাংশ কমলে ঢাকা চাঁদপুর রুটে যাত্রীদের ভাড়া কোনও ক্লাসে কত হবে, তা ঠিকঠাক বলতে পারছেন না বিআইডব্লিউটির কর্মকর্তারা। এমনকি ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত কতদিন কার্যকর থাকবে—এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যেও।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক বাবুলাল বৈদ্য বলেন, ‘অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে এখনও কোনও লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করা হলে সংশ্লিষ্ট লঞ্চের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদ পরবর্তী সময়ে যাত্রীদের চাপ কিছুদিন অব্যাহত থাকবে। তবে লঞ্চ সংকট নেই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-চাঁদপুর রুটে প্রতিদিন প্রায় ৪০টি লঞ্চ চলাচল করছে। এ ছাড়া চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ রুটে ১৪টি এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে আরও সাতটি লঞ্চ চলছে।

Link copied!